লেখক: সাবিত রিজওয়ান
পায়রাবন্দে দুইটা কলেজ আছে। একটা বালিকা কলেজ, আরেকটা সরকারি বালক-বালিকা কলেজ। দুটোই পাশাপাশি, একই এলাকায়। প্রশ্ন হলো, এতে আমার মাথাব্যথা কেন?
আমি ২০২৫ সালে এসএসসি দিয়ে ৩.৩৩ পেয়েছি। ফল খুব ভালো না, এটা আমি মানি। কিন্তু খুব খারাপও না। প্রথম চয়েস দিয়েছিলাম পায়রাবন্দ সরকারি কলেজে। চান্স পাইনি। তখন শুনেছি চারদিক থেকে একই কথা, “রেজাল্ট খারাপ।” বন্ধুরা বলেছে, কিছু শিক্ষক বলেছে, কিছু পরিচিত মানুষও বলেছে। বলাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, শুধু এই কারণে কি আমার নিজের এলাকার কলেজে পড়ার কোনো অধিকার থাকল না?
আমি যে কলেজে চান্স পেয়েছি, সেখানে যেতে প্রতিদিন যাতায়াতে লাগে প্রায় ৮০ টাকা। অনেকের কাছে এটা ছোট অঙ্ক মনে হতে পারে, কিন্তু আমাদের মতো পরিবারের জন্য এটা বড় চাপ। তাহলে এটাকেই কি বলা হবে আমার রেজাল্ট খারাপ করার শাস্তি?
আরেকটা প্রশ্ন আসে। পায়রাবন্দে যদি দুইটা কলেজের প্রয়োজন থাকে, তাহলে আশপাশের এলাকাগুলোর কী হবে? শালমারা, ঠাকুরবাড়ি, ভাঁজের মোড়, বৈরাগীগঞ্জ, বিরাহিমপুর, শালাইপুর এসব জায়গায় তো একটা কলেজও নেই। তাহলে কি শুধু পায়রাবন্দই সব সুযোগ পাবে, আর পাশের গ্রামের ছেলেমেয়েরা দূরে দূরে ঘুরে পড়াশোনা করবে?
আমি বলছি না, সঙ্গে সঙ্গে সরকারি কলেজ বানাতে হবে। অন্তত আধা-সরকারি বা এমপিওভুক্ত একটা কলেজ তো হতে পারে। যেমন জায়গীরে জায়গীর হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ আছে, তেমনি শালমারায় কেন হবে না “শালমারা হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ”? এতে করে শুধু আমি না, আমার মতো অনেক শিক্ষার্থীর জীবন একটু সহজ হবে।
অনেকে হয়তো বলবেন, “এত কলেজের দরকার কী?” কিন্তু আমি উল্টো প্রশ্ন করি, প্রতিদিন ৮০ টাকা ভাড়া দিয়ে দূরের কলেজে যাওয়া কি আমাদের মতো গরিব পরিবারের সন্তানের জন্য কোনো শাস্তির মতো হয়ে দাঁড়ায় না? দূরের কলেজে পড়ার স্বপ্ন অনেকেরই থাকে, আমিও মানি। কিন্তু কোন ক্ষেত্রে সেটা স্বপ্ন, আর কোন ক্ষেত্রে সেটা বাধ্যতা, এই পার্থক্যটা বোঝা দরকার।
আমার হাইস্কুল জীবনের অনেক বন্ধু এখন পায়রাবন্দের কলেজে পড়ে। কেউ জায়গীরে, কেউ পলিটেকনিকে। আলাদা হয়ে গেলাম শুধু আমরা দুজন। একজনের বাড়ি শালমারা, তার ভাড়া আমার চেয়ে ১০ টাকা কম। তবু সে একাদশ শ্রেণির প্রথম সাময়িক পরীক্ষার শুধু দুইটা পরীক্ষা দিতে পেরেছে, বাকিগুলো দেয়নি। প্রতিদিন এত টাকা ভাড়া দিয়ে যাওয়া তার জন্যও কষ্টকর হয়ে উঠেছে।
আমরা গরিব ঘরে জন্মেছি। সামর্থ্য নেই বলে প্রাইভেট পড়তে পারি না, নিয়মিত কলেজে যেতেও পারি না। পরনের জামাকাপড়ও খুব ঝকঝকে নয়। ময়লা প্যান্ট, ময়লা শার্ট, কতবার আর ধুবো? এগুলো হয়তো ছোট কথা মনে হতে পারে, কিন্তু এগুলোই ধীরে ধীরে একজন শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস ভেঙে দেয়।
এই লেখা কোনো অভিযোগ নয়, কোনো হাহাকারও নয়। এটা শুধু একটা প্রশ্ন। শিক্ষা কি শুধু রেজাল্টের পুরস্কার হবে? নাকি শিক্ষা হবে সুযোগের সমতা?
পায়রাবন্দে দুইটা কলেজ থাকতেই পারে। কিন্তু তার পাশাপাশি শালমারা বা আশপাশের এলাকাগুলোতেও অন্তত একটা কলেজ হওয়া কি খুব বড় দাবি? আমরা তো বিশেষ কিছু চাই না। শুধু চাই, পড়াশোনাটা যেন আমাদের জন্য বোঝা না হয়ে দাঁড়ায়, যেন শিক্ষা আমাদের জীবন সহজ করে, কঠিন না করে।
এইটুকুই আমার কথা।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: আহমেদ হোসাইন ছানু। নির্বাহী সম্পাদক: আশিক খান নিতু। সাহিত্য সম্পাদক: মোঃ রহমত আলী। সম্পাদকীয় কার্যালয়: বিপিএল ভবন মতিঝিল ঢাকা- ১০০০। মোবাইল: 01715-907221
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬