এম. কে. জাকির হোসাইন বিপ্লবী
একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে নির্বাচন হওয়ার কথা গণতন্ত্রের উৎসব। ভোটকেন্দ্র হওয়ার কথা মানুষের নিরাপত্তা ও আশার প্রতীক। কিন্তু আজকের বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে যে দৃশ্যপট তৈরি হচ্ছে, তা একটি ভয়াবহ প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে জাতির বিবেকের সামনে—আমরা কি আবারও ব্যালটের বদলে বুলেটের রাজনীতির দিকে ফিরে যাচ্ছি?
জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে দীর্ঘ ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের পতনের পর জনগণ নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল। সেই স্বপ্নের কেন্দ্রে ছিল একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও সহিংসতামুক্ত নির্বাচন। শহীদের রক্তে লেখা সেই অঙ্গীকার ছিল—আর কোনো পরিবারতন্ত্র নয়, আর কোনো বন্দুকের রাজনীতি নয়, রাষ্ট্র পরিচালিত হবে জনগণের ভোটে। কিন্তু আজ, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে এসে সেই স্বপ্নকে পদদলিত করছে পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতির পুরোনো খেলোয়াড় বিএনপি।
১৬ বছর ধরে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের নির্যাতনের শিকার হয়ে জনগণ যখন গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পথে হাঁটছে, ঠিক তখনই বিএনপি আবারও প্রমাণ করছে—তারা জনগণের ভোটে নয়, ক্ষমতার নেশায় বিশ্বাসী। জিয়ার আদর্শের কথা বলে যে দলটি রাজনীতি করে, বাস্তবে সেই আদর্শকে তারাই সবচেয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। শহীদ জিয়া যে জাতীয় ঐক্য, শৃঙ্খলা ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্বপ্ন দেখেছিলেন, বিএনপি আজ তার সম্পূর্ণ বিপরীত পথে অবস্থান করছে।
জাতীয় নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। এই সময়টায় রাজনৈতিক দলগুলোর কথা ছিল নির্বাচনী ইশতেহার নিয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে যাওয়া, উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা বলা। অথচ দেশজুড়ে সংবাদমাধ্যমে উঠে আসছে ভিন্ন চিত্র—যৌথ অভিযানে উদ্ধার হচ্ছে অবৈধ অস্ত্র, বিস্ফোরক ও ধারালো অস্ত্র; অভিযোগ উঠছে ভোটকেন্দ্র দখলের প্রস্তুতির। এসব অভিযোগের তীর ঘুরে ফিরে গিয়ে পড়ছে বিএনপি ও তাদের অঙ্গসংগঠনের দিকেই।
প্রশ্ন একটাই—যদি গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ক্ষমতায় যাওয়ার আস্থা থাকে, তবে অস্ত্র কেন? ব্যালটই যদি শক্তি হয়, তবে বুলেটের মজুত কেন? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রশ্নের উত্তরই বিএনপির রাজনৈতিক চরিত্র উন্মোচন করে দেয়। তারা জানে—জনগণের রায়ে তাদের প্রত্যাবর্তন অনিশ্চিত। তাই তারা নির্বাচনের পরিবেশকে অস্থিতিশীল করে, ভয় ও সহিংসতার মাধ্যমে পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে চায়।
এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ক্ষমতার বাইরে থাকলে তারা বারবার অরাজকতার পথ বেছে নিয়েছে। হরতাল-অবরোধের নামে আগুন সন্ত্রাস, মানুষ পুড়িয়ে হত্যা, রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস—এসব তাদের পুরোনো কৌশল। আজ সেই কৌশলই নতুন মোড়কে ফিরে এসেছে। পার্থক্য একটাই—এবার জনগণ অনেক বেশি সচেতন।
জুলাই বিপ্লব শুধু একটি সরকার পতনের ঘটনা ছিল না; এটি ছিল পরিবারতন্ত্রের রাজনীতির বিরুদ্ধে একটি গণরায়। সেই বিপ্লবে যারা প্রাণ দিয়েছেন, তারা কোনো দলের ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য শহীদ হননি; তারা শহীদ হয়েছেন একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের স্বপ্নে। অথচ বিএনপি আজ সেই শহীদদের রক্তের উপর দাঁড়িয়ে আবারও সহিংস রাজনীতির প্রস্তুতি নিচ্ছে। এটি শুধু রাজনৈতিক অপরাধ নয়, এটি নৈতিক বিশ্বাসঘাতকতা।
আরও উদ্বেগজনক হলো—এই অস্থিতিশীলতার পেছনে বিদেশি আধিপত্যবাদী স্বার্থের গন্ধ। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, একটি দুর্বল ও বিভক্ত বাংলাদেশ সবসময়ই বাইরের শক্তির জন্য সহজ শিকার। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির এই সহিংস ও অগণতান্ত্রিক অবস্থান অনিচ্ছাকৃত হলেও সেই আধিপত্যবাদী পরিকল্পনাকেই সহায়তা করছে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার নয়, বরং সংঘাতময় ও প্রশ্নবিদ্ধ ক্ষমতাই বিদেশি হস্তক্ষেপের দরজা খুলে দেয়।
আজ দেশের সাধারণ মানুষ নতুন কিছু চায়। তারা চায় নতুন দল, নতুন নেতৃত্ব, আদর্শবাদী রাজনীতি। তারা আর চায় না ক্ষমতা একটি পরিবারের উত্তরাধিকার হয়ে থাকুক। তারা চায় রাষ্ট্র পরিচালিত হোক যোগ্যতা ও নৈতিকতার ভিত্তিতে। এই চাওয়াই জুলাই বিপ্লবের মূল প্রেরণা ছিল।
কিন্তু বিএনপি সেই চাওয়ার বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে। ক্ষমতার লোভে তারা উন্মত্ত। রাজনৈতিক সভ্যতার ন্যূনতম শিষ্টাচারও তারা মানতে রাজি নয়। নির্বাচনকে তারা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হিসেবে নয়, বরং একটি যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে দেখছে। আর সেই যুদ্ধের জন্যই তারা ব্যালট নয়, বুলেটের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে জাতির সামনে দুটি পথ—একটি হলো ভয় ও সহিংসতার কাছে নতি স্বীকার করা, অন্যটি হলো জুলাই বিপ্লবের চেতনা ধারণ করে ব্যালটের শক্তিকে রক্ষা করা। ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে, সহিংস রাজনীতি কখনো জনগণের কল্যাণ বয়ে আনে না। বুলেট দিয়ে পাওয়া ক্ষমতা কখনো স্থায়ী হয় না; তা শুধু নতুন রক্তপাতের জন্ম দেয়।
এই প্রবন্ধ কোনো ব্যক্তিগত আক্রোশ নয়, এটি একটি জাতীয় সতর্কবার্তা। নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার যে কোনো চেষ্টা স্বাধীন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের শামিল। যারা অস্ত্র হাতে রাজনীতিতে নামে, তারা গণতন্ত্রের শত্রু। আর গণতন্ত্রের শত্রুদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোই জুলাই যুদ্ধের অঙ্গীকার।
আজ সময় এসেছে স্পষ্টভাবে বলার—বাংলাদেশে ক্ষমতায় যাওয়ার একমাত্র পথ ব্যালট। বুলেট নয়, বোমা নয়, আগুন নয়। জনগণের রায়ই শেষ কথা। এর বাইরে যে কেউ যে পথেই হাঁটুক, সে পথ ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবে।
কারণ জুলাই শহীদরা রক্ত দিয়েছিলেন একটি স্বাধীন, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের জন্য—কোনো নতুন স্বৈরতন্ত্রের জন্য নয়। এই সত্য অস্বীকার করার সাহস কারও নেই।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: আহমেদ হোসাইন ছানু। নির্বাহী সম্পাদক: আশিক খান নিতু। সাহিত্য সম্পাদক: মোঃ রহমত আলী। সম্পাদকীয় কার্যালয়: বিপিএল ভবন মতিঝিল ঢাকা- ১০০০। মোবাইল: 01715-907221
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬