জেসমিন আক্তার মনি, রংপুর
বুড়িমারী স্থলবন্দরসহ লালমনিরহাটের সঙ্গে বিভাগীয় নগরী রংপুরের যোগাযোগ সহজ করতে তিস্তা নদীর ওপর ১২৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা ব্যয়ে সেতু এবং ২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে আঞ্চলিক মহাসড়ক নির্মাণ করা হলেও, তা তেমন কোনো কাজে আসছে না। এই সেতুর ওপর দিয়ে ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় বুড়িমারী থেকে ৫০ কিলোমিটার পথ ঘুরে লালমনিরহাট সদর হয়ে রংপুরে চলাচল করছে ট্রাকসহ বিভিন্ন ভারী যানবাহন। এতে খরচ হচ্ছে অতিরিক্ত টাকা ও সময়।
জানা গেছে, বুড়িমারী স্থলবন্দরসহ লালমনিরহাটের পাটগ্রাম, হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ ও আদিতমারী উপজেলার সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে ‘দ্বিতীয় তিস্তা সেতু’ নির্মাণ করা হয়। সেতুটি লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনা এলাকার সঙ্গে রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার মহিপুর এলাকাকে যুক্ত করেছে। ৮৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের সেতুটি নির্মাণে ব্যয় হয় ১২৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। অন্যদিকে রংপুর নগরীর বুড়িরহাট থেকে গঙ্গাচড়ার শংকরদহের সিরাজুল বাজার পর্যন্ত ১১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের আঞ্চলিক মহাসড়কটি নির্মাণে ব্যয় হয় প্রায় ২৮ কোটি টাকা।
লালমনিরহাট এলজিইডি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১২ সালে সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং ২০১৮ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর এর উদ্বোধন করা হয়। তবে নাজুক সড়কের কারণে চালুর পর প্রথম চার বছর এই সেতু দিয়ে ভারী যান চলাচল করতে দেওয়া হয়নি। পরে ২০২২ সালের ১১ জানুয়ারি সব ধরনের যানবাহন চলাচলের জন্য সেতুটি খুলে দেওয়া হয়। কিন্তু বছর না ঘুরতেই সড়কের বিভিন্ন স্থানে ভাঙন দেখা দিলে স্থানীয় শিক্ষার্থী ও থ্রি-হুইলার মালিক সমিতির সদস্যরা ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন।
আন্দোলনের মুখে রংপুর বিভাগীয় কমিশনারের আদেশে ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখতে আবারও সেতুর উত্তর প্রান্তে ২০২৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর থেকে প্রতিবন্ধক খুঁটি বসানো হয়। ফলে বাস ও ট্রাকসহ ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সে সময় বলা হয়েছিল চলাচলের উপযোগী করে আঞ্চলিক মহাসড়ক পুনর্নির্মাণ না করা পর্যন্ত এই প্রতিবন্ধক বহাল থাকবে, না হলে পণ্যবাহী যানবাহনের চাপে সড়ক পুরোদমে ভেঙে পড়বে। তবে চলাচল বন্ধের দেড় বছর পার হলেও সড়ক পুনরায় চালুর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, থ্রি-হুইলার মালিক সমিতির সিন্ডিকেটের একচ্ছত্র আধিপত্যের কারণেই সেতু দিয়ে ভারী যানবাহন চলাচলের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, লালমনিরহাট জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনা ইউনিয়নের রুদ্রেশ্বর এলাকায় সংযোগ সড়কে আড়াআড়িভাবে লোহার পাইপ দিয়ে তৈরি একটি প্রতিবন্ধক দেওয়া হয়েছে। ফলে সড়কে কোনো বাস বা ট্রাক চলাচল করতে পারছে না। পিকআপ, প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাস কোনোরকমে চলাচল করলেও বুড়িমারী স্থলবন্দর থেকে আসা পণ্যবাহী ট্রাক ও বাসগুলো কালীগঞ্জের কাকিনা বাজার হয়ে লালমনিরহাট জেলা সদর ঘুরে রংপুরের কাউনিয়া তিস্তা সেতুর ওপর দিয়ে চলাচল করছে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) রংপুর কার্যালয় জানায়, রংপুর নগরীর বুড়িরহাট থেকে গঙ্গাচড়ার শংকরদহের সিরাজুল বাজার পর্যন্ত ১১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের আঞ্চলিক মহাসড়কটির কাজ প্রায় ২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০২৩ সালের নভেম্বরে শুরু হয়ে পরের বছরের মার্চে শেষ হয়। দরপত্র অনুযায়ী কার্পেটিং করা পাকা সড়কটি ১৮ ফুট প্রশস্ত। এর বাইরে দুই পাশে ৩ ফুট করে ৬ ফুট ইট বিছানো এবং ৩ ফুট করে দুই পাশে ৬ ফুট মাটি বিছানোসহ মোট ১২ ফুট প্রসস্তকরণ করা হয়। নির্মাণের পর সড়কটি দিয়ে ভারত থেকে আমদানি করা পাথরসহ পণ্য বহনকারী ভারী ট্রাক ও যাত্রীবাহী বাস চলাচল শুরু হয়েছিল। তবে সড়কের দুই পাশে ইট-মাটি ধসে পড়ার অভিযোগ উঠলে ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়।
কোটি টাকার সংস্কারেও বদলায়নি গোপালগঞ্জ-তালা-কেকানিয়া সড়কের চিত্র
আমদানিকারক ব্যবসায়ী ও ট্রাক-ট্যাংক লরি শ্রমিক নেতাদের ভাষ্য, বুড়িমারী স্থলবন্দর থেকে আসা আমদানিকৃত পণ্যের ট্রাকগুলোকে আবার লালমনিরহাট জেলা সদর ঘুরে রংপুরের কাউনিয়া তিস্তা সেতু দিয়ে যেতে হচ্ছে। এতে ৫০ কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ ঘুরতে হয়। রংপুর থেকে লালমনিরহাট শহর হয়ে বুড়িমারীর দূরত্ব প্রায় ১৪০ কিলোমিটার; যা গঙ্গাচড়ার এই সেতু দিয়ে গেলে হয় প্রায় ৯০ কিলোমিটার।
ব্যবসায়ীরা জানান, বুড়িমারী থেকে লালমনিরহাট হয়ে রংপুর আসতে ট্রাকপ্রতি ভাড়া পড়ে ১৭ থেকে ১৮ হাজার টাকা। অথচ শেখ হাসিনা সেতু (দ্বিতীয় তিস্তা সেতু) দিয়ে এলে ভাড়া পড়ত ৯ থেকে ১০ হাজার টাকা।
রংপুর নগরীর চেকপোস্ট এলাকার ব্যবসায়ী রাজ মাহমুদ বলেন, শতকোটি টাকা দিয়ে সেতু নির্মাণ করা হলেও তা ব্যবসায়ীদের কোনো কাজে আসছে না। পণ্য পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ জনগণের ওপর।
রংপুর জেলা ট্রাক, ট্যাংক লরি ও কাভার্ডভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. হাফিজুর রহমান হাফিজ বলেন, আমরা আশা করেছিলাম মহিপুর সেতু হলে শ্রমিকদের কষ্ট কমবে। কিন্তু সেতু হওয়ার পরও সুবিধা পাচ্ছি না।
লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলা থ্রি-হুইলার মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুস সাত্তার বলেন, হাতীবান্ধা-রংপুর রুটে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ জন দরিদ্র মানুষ থ্রি-হুইলার চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। এসব যান হাইওয়েতে চলাচল নিষেধ বলে আমরা এই বিকল্প রুটে চালাই। মাঝেমধ্যেই পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা পথটি খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়ে আমাদের সমস্যা তৈরি করছেন। এর আগেও এটি খুলে দেওয়া হয়েছিল, তখন বাস-ট্রাক চলাচলের কারণে সড়ক ভেঙে যায় এবং ব্যাপক যানজট সৃষ্টি হয়।
এলজিইডি লালমনিরহাট জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. কাওছার আলম বলেন, আন্দোলনের পর বিভাগীয় কমিশনারের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে সেতুর ওপর দিয়ে ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। এখানে সেতু বা সড়কের মূল কাঠামোতে কোনো সমস্যা নেই।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: আহমেদ হোসাইন ছানু। নির্বাহী সম্পাদক: আশিক খান নিতু। সাহিত্য সম্পাদক: মোঃ রহমত আলী। সম্পাদকীয় কার্যালয়: বিপিএল ভবন মতিঝিল ঢাকা- ১০০০। মোবাইল: 01715-907221
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬