মহম্মদ মফিজুল ইসলাম
কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত
রমজান মাসের শেষ দশকের গভীরে একটি মহান রাত লুকিয়ে আছে। সেই রাতের নাম লাইলাতুল ক্বদর। মুসলিম হৃদয়ে এই রাতের মর্যাদা অপরিসীম। কারণ এই রাত আল্লাহর বিশেষ রহমতের রাত। এই রাত ক্ষমার রাত। এই রাত মানুষের ভাগ্য নির্ধারণের রাত। পবিত্র কোরআনে এই রাতের কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। কোরআনের একটি সম্পূর্ণ সূরা এই রাতকে ঘিরেই নাজিল হয়েছে। সেই সূরার নাম সূরা ক্বদর। সেখানে বলা হয়েছে লাইলাতুল ক্বদর
হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। এর অর্থ একটি রাতের ইবাদত তিরাশি বছর চার মাস ইবাদতের সমান মর্যাদা পায়। এটি মানুষের জীবনের জন্য এক অপূর্ব সুযোগ। এক অসীম অনুগ্রহ। এই রাতেই মানবজাতির পথনির্দেশের মহান গ্রন্থ কোরআনের সূচনা হয়। আল্লাহ বলেন, "আমি কোরআন নাজিল করেছি ক্বদরের রাতে।" এই বাক্য মানুষের ইতিহাসের এক গভীর সত্যকে মনে করিয়ে দেয়। অন্ধকার পৃথিবীতে আলোর পথ শুরু হয়েছিল সেই রাতেই।
হাদিসে এই রাতের মর্যাদা আরও স্পষ্ট হয়েছে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ বলেছেন, "যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় লাইলাতুল ক্বদরের রাতে ইবাদত করে তার পূর্বের সব গুনাহ ক্ষমা করা হয়।" এই ঘোষণা মানুষের জন্য এক মহান সুসংবাদ। মানুষ ভুল করে। মানুষ পাপ করে। কিন্তু আল্লাহ তার জন্য ক্ষমার দরজা খোলা রাখেন। লাইলাতুল ক্বদর সেই দরজার এক বিস্ময়কর মুহূর্ত। এই রাত সম্পর্কে কোরআনে বলা হয়েছে যে এই রাতে ফেরেশতারা অবতরণ করেন। ফেরেশতারা পৃথিবীতে নেমে আসেন শান্তির বার্তা নিয়ে। কোরআনের ভাষায় এই রাত ফজর পর্যন্ত শান্তিতে পূর্ণ থাকে। এখানে একটি গভীর আধ্যাত্মিক সত্য আছে। যখন মানুষ সৃষ্টিকর্তার দিকে ফিরে আসে তখন পৃথিবী শান্তিতে ভরে ওঠে। মানুষের হৃদয়ে আলো জ্বলে ওঠে। মানুষের মন পরিশুদ্ধ হয়। সমাজে দয়া ও সহমর্মিতা জন্ম নেয়।
হাদিসে লাইলাতুল ক্বদর খোঁজার জন্য বিশেষ নির্দেশও আছে। মহানবী (সা.) বলেছেন রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে এই রাত অনুসন্ধান করতে। অর্থাৎ একুশ, তেইশ পঁচিশ, সাতাশ অথবা ঊনত্রিশ রমজানের রাতের যেকোনো একটি হতে পারে সেই মহিমান্বিত রাত। এর মধ্যে একটি গভীর শিক্ষা আছে। মানুষ যেন পুরো সময় জেগে থাকে ইবাদতে। মানুষ যেন শুধু একটি রাতের অপেক্ষায় অলস না থাকে। বরং প্রতিটি রাতকে মূল্যবান মনে করে। মহানবী নিজে শেষ দশকে ইবাদতে আরও মনোযোগী হয়ে উঠতেন। তিনি পরিবারকেও জাগিয়ে তুলতেন। তিনি রাত জেগে নামাজ পড়তেন। দোয়া করতেন। কোরআন তিলাওয়াত করতেন। এই জীবনচর্চা মুসলমানদের জন্য এক মহান আদর্শ।
লাইলাতুল ক্বদরের একটি বিখ্যাত দোয়া হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। এই দোয়ার বাংলা উচ্চারণ হলো-- "আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফাফু আন্নি।" এর অর্থ "হে আল্লাহ আপনি ক্ষমাশীল। আপনি ক্ষমা করতে ভালোবাসেন। তাই আমাকে ক্ষমা করুন।" এই ছোট দোয়ার মধ্যে এক গভীর আবেদন আছে। মানুষ তার সব অহংকার ভেঙে আল্লাহর কাছে দাঁড়ায়। সে নিজের দুর্বলতা স্বীকার করে। সে ক্ষমা চায়। এই বিনয়ই ইবাদতের আসল সৌন্দর্য।
আজকের পৃথিবী অস্থির। যুদ্ধ আছে। বৈরিতা আছে। মানুষের মনে ভয় আছে। অনেক সময় মানুষের জীবন অন্ধকারে ঢেকে যায়। ঠিক এই সময় লাইলাতুল ক্বদর
আমাদের একটি বড় শিক্ষা দেয়। এই রাত মনে করিয়ে দেয় যে আলোর উৎস একটাই। সেই উৎস আল্লাহর রহমত। মানুষ যদি তার হৃদয়কে সৎ পথে ফিরিয়ে আনে তবে সমাজেও পরিবর্তন আসে। লাইলাতুল ক্বদর তাই শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়। এটি একটি নৈতিক জাগরণ। এটি আত্মশুদ্ধির এক মহামুহূর্ত। এই রাত মানুষকে শেখায় বিনয়। শেখায় কৃতজ্ঞতা। শেখায় মানবতার মূল্য।
রমজানের শেষ প্রহরে তাই মুসলিম হৃদয়ে এক বিশেষ আলো জ্বলে ওঠে। মসজিদে মসজিদে ইবাদতের ধ্বনি শোনা যায়। ঘরে ঘরে দোয়ার হাত ওঠে। মানুষের চোখে অশ্রু ঝরে। সেই অশ্রু অনুশোচনার। সেই অশ্রু আশা ও ভালোবাসার। মানুষ বিশ্বাস করে এই রাত তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। একটি রাত তার হৃদয়কে নতুন করে গড়ে তুলতে পারে। তাই লাইলাতুল ক্বদর শুধু একটি রাত নয়। এটি একটি নতুন শুরু। এটি অন্ধকারের ভেতর থেকে আলো খুঁজে পাওয়ার এক মহান মুহূর্ত।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: আহমেদ হোসাইন ছানু। নির্বাহী সম্পাদক: আশিক খান নিতু। সাহিত্য সম্পাদক: মোঃ রহমত আলী। সম্পাদকীয় কার্যালয়: বিপিএল ভবন মতিঝিল ঢাকা- ১০০০। মোবাইল: 01715-907221
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬