সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি:
ইউরোপের দেশ ইতালিতে ভালো চাকরি ও উচ্চ বেতনের লোভ দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া এক আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের অন্যতম প্রধান দুই সদস্যকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর থানা পুলিশের একটি চৌকস দল সিলেটের শাহপরাণ থানা এলাকায় ঝটিকা অভিযান চালিয়ে ওই নারী ও তার ভাইকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গ্রেফতারকৃতরা হলেন সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার ইছাকপুর গ্রামের বাসিন্দা মোছা. শোবি বেগম (৩০) এবং তার ভাই শামছুল (২৮)। তাদের বিরুদ্ধে মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে দায়ের করা অন্তত চারটি মামলা রয়েছে।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জগন্নাথপুর থানার এসআই মতিউর রহমান, এসআই মোস্তাফিজুর রহমান, এসআই অনিক পাল এবং এএসআই আলাউদ্দিনসহ পুলিশের একটি চৌকস দল শাহপরাণ থানা পুলিশের সহায়তায় যৌথ অভিযান পরিচালনা করে তাদের আটক করে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই চক্রটি মূলত তিন দেশ থেকে পরিচালিত একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেট। শোবি বেগমের স্বামী প্রবাসী মেশকার মিয়া ইতালিতে অবস্থান করছেন। এছাড়া তার দুই ভাইয়ের মধ্যে একজন ইতালিতে এবং অপরজন লিবিয়ায় অবস্থান করছেন। প্রবাসে থাকা এই তিনজন পুরো চক্রের নেটওয়ার্ক ও আর্থিক লেনদেন নিয়ন্ত্রণ করেন। আর বাংলাদেশে অবস্থানরত শোবি বেগম ও তার ভাই শামছুল স্থানীয় পর্যায়ে গ্রামের সহজ-সরল ও বেকার যুবকদের ফাঁদে ফেলতেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দেশে টাকা নেওয়ার পর শুরু হতো আসল খেলা। ইতালিতে সরাসরি পাঠানোর কথা বলে ভুক্তভোগীদের প্রথমে লিবিয়ায় পাঠাত চক্রটি। লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর শোবি বেগমের ভাইয়ের নিয়ন্ত্রণে থাকা মাফিয়া চক্রের সদস্যরা তাদের অপহরণ করে মরুভূমির ভেতরের গোপন টর্চার সেলে নিয়ে যেত। সেখানে লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে হাত-পা ভেঙে ফেলা, ইলেকট্রিক শক দেওয়া, আগুনের ছ্যাঁকা দেওয়ার মতো নারকীয় নির্যাতন চালানো হতো। সেই নির্যাতনের ভিডিও বাংলাদেশে স্বজনদের কাছে পাঠিয়ে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ আদায় করা হতো।
কলকলিয়া ইউনিয়নের সাদীপুর গ্রামের ভুক্তভোগী সইফুল মিয়া জানান, ইতালি পাঠানোর কথা বলে চক্রটি তার কাছ থেকে ২৬ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
একই গ্রামের আবু তাহের মিয়া জানান, তার ছেলে বিন আমিনকে ইতালি পাঠানোর কথা বলে ২৫ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে।
একই গ্রামের জহুর আলীর ছেলে সেলিম জানান, তার কাছ থেকে ৪৬ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছে চক্রটি।
এছাড়া এলাক মিয়ার মেয়ের জামাই এমরান হোসেন আদিলসহ পুরো সুনামগঞ্জের অসংখ্য পরিবার এই চক্রের ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে।
এ বিষয়ে জগন্নাথপুর থানার এসআই নূর হোসেন জানান, গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। তাদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, মানবপাচারের মতো জঘন্য অপরাধের সাথে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। লিবিয়া ও ইতালিতে অবস্থানরত চক্রের অন্য সদস্যদের বিষয়েও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং পুলিশের অভিযান অব্যাহত থাকবে।