নিশাত রহমান নিশি
জুলাই চলমান।
বেলা ৫টা। কিছুক্ষণ পরই চারদিকে অন্ধকার হয়ে আসবে। অবশ্য আয়োজন করে অন্ধকার ঘনিয়ে আসার দরকার নেই। কয়েক দিন যাবৎ ১২-গেজ শটগান, গ্রেনেড লঞ্চার, টিয়ার গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেডের বিকট শব্দে চারদিক কুটকুটে কালো হয়ে আছে। এর মধ্যে উড়ে যাচ্ছে সাদা-কালো ধোঁয়া। ধোঁয়াগুলো যেন কতগুলো মায়ের সন্তান হারানোর ক্ষোভ আর আর্তনাদের প্রতিচ্ছবি।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সবকিছু নিস্তব্ধ হয়ে যায়। তার সঙ্গে নিস্তব্ধ হয়ে যায় গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় গলাকাটা মুরগির মতো ছটফট করতে থাকা তাজা প্রাণগুলো। সারাদিন কেবল রাস্তা থেকে ক্রমাগত হিংস্র গুলির শব্দ বেজে ওঠে এবং আহাজারির কান্না। যেন চারদিকে শকুনের চলাফেরা। যে তার শিকারের সামনে আসবে, তাকেই খুবলে খুবলে খাবে। অথচ শকুনদের ভয় না পেয়ে সামনে গিয়ে দুই হাত মিলিয়ে দিচ্ছে যুবকরা।
কোথা থেকে এই তরুণ যুবকদের এত সাহস জেগে উঠল, তা শকুনগুলো ভেবে কুল পাচ্ছে না।
আজ শুক্রবার—
এ বাড়ির ছোট মেয়ের নাম রিয়া। মিস্টার গোপের একমাত্র সন্তান। মিস্টার গোপ পুলিশের বড় কর্মকর্তা। বিয়ের দীর্ঘ ১৬ বছর পর তার কন্যা তার ঘরে আলো করে আসে। তার বুক শীতল হয়। রিয়ার বয়স ৫-৬ বছর হবে। প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী। মিস্টার গোপ তাকে বেশ কয়েক দিন স্কুলে যেতে দেন না। গেটের বাইরে যাওয়া তার জন্য সম্পূর্ণ নিষেধ। এমনকি রিয়ার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা, ছাদেও যেতে দেয় না। বাবা ছাদে তালা দিয়ে রেখে, চাবি নিয়ে বাইরে যান। রাতে ফিরে আসেন।
আজ বাবা বাড়িতে আছেন। রিয়া বাবার কোলে বসে আদুরে স্বরে বলে,
— বাবা, একটু ছাদের চাবিটা দেবে? আমি শুধু গোলাপগাছে পানি দিয়েই চলে আসব। আর দেখব, লাল গোলাপটা ফুটেছে কি না। পুরো ছাদজুড়ে শুধু সাদা আর হলুদ রঙের গোলাপ। লাল গোলাপটা যেদিন ফুটবে, আমি তোমাকে দেব। কারণ আমি তোমাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি। আমি কার্টুনে দেখেছি, লাল গোলাপ হলো ভালোবাসার প্রতীক। নবিতা ডোরেমনকে লাল গোলাপ দিয়েছে। ডোরেমন অনেক খুশি হয়েছে। তুমিও অনেক খুশি হবে। লাল গোলাপটা ফুটেছে কি না দেখেই চলে আসব। ছাদের চাবিটা দাও না, বাবা?
মিস্টার গোপ আজ মেয়ের কথা ফেলতে পারলেন না। চাবিটা দিলেন। বললেন—
— যাও মা, গিয়ে দেখো লাল গোলাপটা ফুটেছে কি না। আমি ওয়াটারিং ক্যান নিয়ে আসছি। দুজন মিলে ফুলগাছে পানি দেব। ফুলগুলো হয়তো শুকিয়ে যাচ্ছে। তুমি যাও, আমি এখনই আসছি।
রিয়া খুশিতে চাবি নিয়ে ছাদে দৌড় দিল। মিস্টার গোপ ওয়াটারিং ক্যান আনতে বারান্দায় গেলেন।
রিয়া ছাদের তালা খুলে তার প্রিয় ফুলগুলো দেখে খুশিতে লাফিয়ে উঠল। আজ কত দিন পর সে ফুলগাছগুলো দেখছে। কত দিন পর ফুলগুলোকে সে হাত দিয়ে ছুঁল! তবে লাল গোলাপ ফুটেছে কি না, এখনো খুঁজে পাচ্ছে না। মাইকে একটা গান বাজছে,
কত বিপ্লবী বন্ধুর রক্তে রাঙা,
বন্দীশালার ওই শিকলভাঙা।
তাঁরা কি ফিরিবে আজ সুপ্রভাতে,
যত তরুণ অরুণ গেছে অস্তাচলে।
এমন কঠিন গান রিয়া কখনো শোনেনি। তবুও তার ভীষণ ভালো লাগছে। গান শুনতে শুনতে সে হাজারো সাদা-হলুদ গোলাপের মধ্যে বাবার জন্য লাল গোলাপটা খুঁজছে।
হঠাৎই রিয়া আকাশ চিরে আগুনের মতো লম্বা কিছু একটা ধেয়ে আসতে দেখল। বিকট শব্দ। ওয়াটারিং ক্যান ফেলে মিস্টার গোপসহ বাড়ির সকলে ছাদের দিকে দৌড় দিল। মিস্টার গোপ ছাদে এসে দেখলেন, পুরো ছাদজুড়ে সাদা ও হলুদ গোলাপ। তার মধ্যে একটা টকটকে লাল গোলাপ ফুটে আছে। লাল গোলাপটি যেন সব ফুলের সৌন্দর্য কেড়ে নিয়েছে। পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্য কেড়ে নিয়ে লাল গোলাপটা যেন জ্বলজ্বল করছে।
হঠাৎ একটা মিষ্টি কণ্ঠস্বর তার কানে বেজে উঠল। যেন লাল গোলাপটি তাকে ফিসফিসিয়ে বলছে—
“আমি ফুল, আমায় ছিঁড়ো না, আমায় ছিঁড়ো না।”
বাক্যটি বারবার আকাশে প্রতিধ্বনিত হয়ে মিস্টার গোপের কানে বেজে বেজে উঠছে। মিস্টার গোপের কান ফেটে যাচ্ছে। তিনি চিৎকার করে উঠলেন।