লেখকঃ মোহাম্মদ ইমতিয়াজ আহম্মেদ আনিক
জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে মানুষ চায় স্বাধীতা। প্রশ্ন করতে, যুক্তি দিতে, বেছে নিতে। বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়নের এই যুগে অনেকেই নিজেদের চেতনার কেন্দ্র থেকে সরিয়ে রাখে বিশ্বাস নামের কথাটি। তাদের চোখে যা দেখা যায় না, তা নেই। যাকে ছোঁয়া যায় না, তার অস্তিত্বও নেই। তারা বলে— সবকিছুর ব্যাখ্যা আছে, আর যা ব্যাখ্যাতীত, সেটি শুধু অজ্ঞতার আবরণ।
এই কথাগুলো যখন দিনভর আলোয় ঢাকা থাকে, মানুষ তখন বড় আত্মবিশ্বাসী হয়। যখন সবকিছু হাতে, নিয়ন্ত্রণে, হিসেবের মধ্যে থাকে — তখন কাউকে প্রয়োজন হয় না, এমনকি নিজের ভেতরের মৃদু অনুরণনকেও নয়। জীবনের গতিপথ তখন সহজ। সকাল থেকে রাত, সময়ের ছকে বাঁধা। যে কাজ করলে সফলতা আসে, সেই কাজই ‘সত্য’ — এই সরল ধারণা নিয়েই জীবন চলে।
কিন্তু জীবনের সব মুহূর্ত এক রকম থাকে না।
কিছু মুহূর্ত আসে যেগুলোতে চারপাশের আলো নিভে যায়। যখন যুক্তিগুলো অসাড় হয়ে পড়ে, অঙ্কের হিসেব মিলতে চায় না, অভ্যস্ত শব্দগুলো গিলে ফেলে এক অদ্ভুত নিরবতা। যখন জীবনের সমস্ত প্রস্তুতি, সমস্ত অহংকার এক নিমিষে ভেঙে পড়ে — তখন মানুষ হঠাৎ করে অনুভব করে নিজের অসহায়ত্ব।
অসুস্থতা, দুর্ঘটনা, হঠাৎ শূন্যতা, জীবনের উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেলা — এসবের সামনে দাঁড়ালে মানুষ চাইলেও তার যুক্তি ধরে রাখতে পারে না। একটা চাপা শূন্যতা তাকে ঘিরে ধরে। তখন আর “আমি সব পারি” বলা যায় না। বলা যায় না, “সব আমার হাতে”। বরং হঠাৎ মনে হতে থাকে — যদি কেউ থাকতো, যে দেখছে, যে বুঝছে, যে পাশে থাকছে…
সেই “কেউ” কে? মানুষ জানে না। তার নাম নেই, রূপ নেই, কোনো ধর্মীয় ভাষা নেই। কিন্তু তবু সেই মুহূর্তে, কেউ একজনকে ভেতরে ভেতরে খোঁজা শুরু হয়। এক ধরনের আকুতি, যা ভাষাহীন, ধর্মহীন, ব্যক্তিহীন — তবু খুব বাস্তব।
যখন কেউ হাসপাতালের আইসিইউর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে, প্রিয় মানুষের নিঃশ্বাস ধরা পড়ে কি না সেটা শুনছে, তখন তার চোখে যুক্তির জয় নয় — আশার জন্য কান্না। তখন তার মুখে “হবে নিশ্চয়” — এই বিশ্বাস। সে জানে না কে করবে, কীভাবে হবে — তবু একটা অদৃশ্য শক্তিকে ডেকে বসে।
যখন কেউ গভীর সমুদ্রে একা পড়ে যায়, যখন খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে নিচে তাকিয়ে অন্ধকার দেখে, যখন কোনো ফোন আর বেজে ওঠে না, কোনো দরজা আর খোলে না — তখন মানুষ আর কোনো তত্ত্ব খোঁজে না। তখন খোঁজে একটা আশ্রয়, একটা আশ্বাস।
তখন চুপচাপ বলে— “যদি কিছু থাকো… আমাকে এখান থেকে বাঁচাও।”
সেই ‘তুমি’ কে? কেউ জানে না।
কিন্তু সত্যিটা হলো — এমন একটা সময় জীবনে একবার না একবার আসে, যখন সবাই সেই ‘তুমি’-কে ডাকে। কেউ উচ্চস্বরে, কেউ চোখের জলে, কেউ কেবল চুপচাপ আকাশের দিকে তাকিয়ে।
তখন আর কেউ নাস্তিক থাকে না।
কারণ নাস্তিকতা হলো যুক্তির ওপর দাঁড়ানো আত্মবিশ্বাস। আর সেই আত্মবিশ্বাস তখনই কাজ করে, যখন মাটি পায়। যখন চারপাশে আলো থাকে, প্রিয় মানুষ পাশে থাকে, শরীর সুস্থ থাকে, ভবিষ্যৎ কিছুটা পরিষ্কার থাকে।
কিন্তু জীবন তো সবসময় মাটি দেয় না। কখনো সেটা কাঁপে। কখনো একদম সরে যায়। তখনই মানুষ মনে করে — আমি কি একা? কেউ কি নেই?
অথচ সারাটা জীবন সে তো একাই ছিল। কাউকে ডাকেনি। কোনো কিছুর অস্তিত্বে বিশ্বাস রাখেনি। তাহলে আজ কেন?
কারণ মানুষ শুধু চিন্তা করা প্রাণী নয়, সে এক অনুভবশীল সত্তা। যুক্তি তার দিশা হতে পারে, কিন্তু বিপদে পড়লে, অসহায় হলে — তার হৃদয় জেগে ওঠে এক মৌলিক চাহিদায়। আশ্রয়ের চাহিদা, ভরসার চাহিদা, বাঁচার চাহিদা।
যে মানুষ সবসময় বলে এসেছে— “আমি কাউকে মানি না”, সেও গভীর রাতে একা বিছানায় শুয়ে যখন নিজের মৃত্যুকে কল্পনা করে, বা হারিয়ে যাওয়া কারো মুখ মনে পড়ে — তখন চোখে পানি চলে আসে। সে জানে না কার জন্য, কার কাছে, কিন্তু ভেতরটা কেঁপে ওঠে।
সেই কম্পনই মানুষকে আবার বিশ্বাসের দিকে নিয়ে যায়।
এ বিশ্বাস কোনো ধর্ম নয়, কোনো নিয়ম নয়, কোনো বই পড়ে শেখা নয়। এটা স্বাভাবিক, সহজাত, মানুষ হয়ে জন্মানোর ফল।
জন্মের পর শিশুর প্রথম কান্না, মৃত্যুর আগে একজন বৃদ্ধের শেষ দৃষ্টিপাত — দুটোই এমন কিছু মুহূর্ত, যেখানে যুক্তির ভাষা নেই। সেখানে কেবল অনুভব, কেবল আকুলতা।
তাই বলা যায় — কোনো এক জায়গায়, কোনো এক মুহূর্তে, কেউ কখনোই পুরোপুরি নাস্তিক থাকে না।
যে বিশ্বাস মানুষের মধ্যে জাগে অসহায় সময়ে, সেটা কখনো মিথ্যা হয় না। সেটাই তার আসল চেতনা, তার প্রাণের সত্য।
এই সত্য কোনো ধর্মের গল্প নয়, কোনো নামের বন্দনা নয়, কোনো পবিত্র চিহ্নের প্রতিচ্ছবি নয়।
এটি কেবল একজন মানুষের নিঃশব্দ স্বীকারোক্তি — “আমি জানি না তুমি কে, কিন্তু আমি জানি, আমি একা নই।”
যেখানে মানুষ স্বীকার করে — তার ভেতরে কোথাও একটা চুপচাপ আশ্রয় আছে, একান্ত নিজের মতো। কেউ হয়তো তাকে সারা জীবন অস্বীকার করে, কেউ আবার প্রতিদিন ডাকে — কিন্তু সেই ‘কিছু একটা’ থেকে কেউই সম্পূর্ণ মুক্ত নয়।
এটা কোনো ধর্ম নয়, কোনো নিয়ম নয়, এটা মানুষের হৃদয়ের নিঃশব্দ প্রার্থনা।