নিজস্ব প্রতিবেদক:
পুরান ঢাকা ঐতিহাসিক কাল থেকেই আধ্যাত্মিক সাধনা, সংস্কৃতি ও সুফিবাদের এক উর্বর ভূমি। এই জনপদের আধ্যাত্মিক জাগরণে বকশীবাজার খানকা শরীফ এক অনন্য আলোকবর্তিকা। বিশ শতকের বরেণ্য সুফি সাধক শাহসূফি হযরত হাফেজ জহুরুল হক মোবারকী আল-কাদেরী (রহ.) এই খানকা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পুরান ঢাকায় প্রকৃত তরিকত ও সুফি দর্শনের প্রসার ঘটিয়েছেন। আগামী ২৯ সেপ্টম্বর ২০২৬ মঙ্গলবার রাত ৮.৩০ ঘটিকায় ঢাকার ঐতিহ্যবাহী বকশি বাজার খানকাহ শরিফে অনুষ্ঠিত হবে শাহসূফি হযরত হাফেজ জহুরুল হক মোবারকী (রহ.) এর পবিত্র ওরশ শরীফ।
পবিত্র মেহফিলে দোয়া ও মুনাজাত পরিচালনা করবেন, বকশি বাজার দরবার শরীফের বর্তমান গদীনশীন পীর, বিশিষ্ট সমাজসেবক, সুফি স্কলার, শীর্ষ ব্যবসায়ী, দানবীর, ফকীর শাহ্ সাঈদ আনওয়ার আল মোবারকী ক্বাদরী, চিশতি পীর কেবলা।
মেহফিলে সকল স্তরের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং খানকাহ শরীফের সকল মুরীদান ,অসংখ্য আশেকে রাসূল, বরেণ্য শিক্ষাবিদ, বিশিষ্ঠ ব্যাবসায়ী, সরকারের উচছপদস্ত’’ কর্মকর্তা, সাংবাদিক, ওলামা মাশায়েক ও ভক্তরা অংশ গ্রহন করবেন।
শাহসূফি হযরত হাফেজ জহুরুল হক মোবারকী (রহ.) প্রতিষ্ঠিত এই খানকার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি, জিকির-আযকার এবং নবীপ্রেমের যে ধারা সূচিত হয়, তা পুরান ঢাকার ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের গভীরভাবে প্রভাবিত করে। হযরত মোবারকী (রহ.) তাঁর ভক্ত ও অনুসারীদের দুনিয়াবি মোহের ঊর্ধ্বে থেকে মানবতার সেবা ও আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ সাধনের শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁর বহু মূল্যবান সাহিত্যকর্ম ও কবিতা ক্বলবে (হৃদয়ে) নবীপ্রেমের চেরাগ প্রজ্বালিত করেছে।
ঢাকার সুফি সাহিত্য এবং সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে হযরত হাফেজ জহুরুল হক মোবারকী আল-ক্বাদরী (রহ.) ছিলেন একজন যুগান্তকারী ব্যক্তিত্ব।
হযরত হাফেজ জহুরুল হক মোবারকী (রহ.) ১৯২১ সালে পুরান ঢাকার চকবাজারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পুরো জীবন কেটেছে খোদাপ্রেম, রাসূলপ্রেম (সা.) ও মানবসেবার ব্রতে। তিনি বকশীবাজার খানকাকে শুধু ইবাদত-বন্দেগির স্থান হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখেননি, বরং একে বানিয়েছেন ইলমে মারেফাত ও নৈতিক শিক্ষার কেন্দ্র। শরিয়ত ও তরিকতের এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়ে তিনি সাধারণ মানুষের অন্তরে ইসলামের উদার ও শান্তিময় বার্তা পৌঁছে দেন।
তিনি কেবল একজন সুফি সাধকই ছিলেন না, বরং একাধারে শায়ের (কবি), সাহিত্যিক, আবৃত্তিকার এবং প্রখ্যাত বাগ্মী ছিলেন । ১. ভাষাগত দক্ষতা ও সাহিত্য: তিনি শৈশব থেকেই উর্দু, ফার্সি এবং আরবি ভাষায় অগাধ পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। মাত্র ১২ বছর বয়সে তার প্রথম মরমী কবিতা প্রকাশিত হয়। তার সাহিত্যকর্মে আধ্যাত্মিক প্রেম এবং মহানবীর (সা.) প্রশংসামূলক নাত অত্যন্ত গুরুত্ব পেয়েছে । ২. জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংযোগ: ১৯৪৮ সালে কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ঢাকা সফরের সময় রেসকোর্স ময়দানে তার বক্তৃতার পূর্বে হাফেজ জহুরুল হক মোবারকী একটি নাত পাঠ করেছিলেন। এছাড়াও রেডিও পাকিস্তানের ঢাকা কেন্দ্রের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি আল্লামা ইকবালের একটি নাত আবৃত্তি করে সকলকে মুগ্ধ করেন । ৩. উপাধি ও স্বীকৃতি: তার সুমধুর কণ্ঠস্বর এবং কাব্য প্রতিভার স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে ‘বুলবুল-এ-বাঙাল’ (বাংলার বুলবুল) উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছিল। তার রচিত ‘গজলামে হারাম’ কাব্যগ্রš’টি মুসলিম সুফি সাহিত্যে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত।
বর্তমানেও বকশীবাজার খানকা শরীফ তাঁর সুযোগ্য উত্তরসূরিদের মাধ্যমে সেই একই পš’ায় আধ্যাত্মিক ও নৈতিক সেবা চালিয়ে যা”িছ। হানাহানি ও সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে ওঠে মানবপ্রেম ও ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠায় এই খানকার ভূমিকা অত্যন্ত গভীর। পুরান ঢাকার সুফি ঐতিহ্য সংরক্ষণ, প্রচার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মাঝে প্রকৃত আত্মিক ও মানবিক মূল্যবোধ ছড়িয়ে দিতে বকশীবাজার খানকা ও হযরত হাফেজ জহুরুল হক মোবারকীর (রহ.) অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
বকশিবাজার দরবার শরীফ শুধু একটি আধ্যাত্মিক কেন্দ্রই নয়, বরং সুফিবাদের আলোকে ইসলামি মূল্যবোধ জাগ্রত করা এবং আর্তমানবতার সেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। এ কারণে ইসলামি বর্ষপঞ্জির প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ দিবস এখানে বিশেষভাবে পালিত হয়।
পুরান ঢাকার ইতিহাস মানেই কেবল জীর্ণ প্রাসাদের সারি নয়, বরং এর প্রতিটি অলিগলিতে মিশে আছে এক গভীর আত্মিক আভিজাত্য। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ-পরবর্তী সময়ে ঢাকা যখন একটি নতুন প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে, তখন থেকেই বকশীবাজার এলাকাটি সুফি সাধনা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের এক মহিমান্বিত কেন্দ্রে পরিণত হয়। তখনকার ঢাকার চিত্রটি ছিল আজকের চেয়ে একেবারেই ভিন্ন—সরু গলির মাথায় খোলা উঠান, পুরনো দালানের ছাদে বিকেলের আড্ডা, আর বাতাসে ভেসে আসা উর্দু ও ফার্সি নাতের সুর। বইয়ের পাতায় পড়া সেই ইতিহাস যখন নিজের অভিজ্ঞতার সাথে মেলাতে যাই, তখন বকশীবাজার খানকাহর (ফকির জহুরুল হক মোবারকী) গুরুত্বটি আরও প্রখর হয়ে ধরা দেয়।
এই ঐতিহ্যের প্রাণপুরুষ ছিলেন হযরত হাফেজ জহুরুল হক মোবারকী আল-ক্বাদরী (রহ.)। তিনি কেবল একজন সুফি সাধকই ছিলেন না, বরং একাধারে শায়ের, প্রখ্যাত বাগ্মী এবং বহুভাষাবিদ ছিলেন। উর্দু, ফার্সি ও আরবি ভাষায় তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য তাঁকে সে সময়ের সুধী মহলে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। তাঁর রচিত ‘গজলামে হারাম’ কাব্যগ্রন্থটি আজও সুফি সাহিত্যে এক অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত। ১৯৪৮ সালে কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ঢাকা সফরের সময় রেসকোর্স ময়দানে তাঁর নাত পাঠ এবং রেডিও পাকিস্তানের ঢাকা কেন্দ্রের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আল্লামা ইকবালের কালাম আবৃত্তি ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। তাঁর সেই সুমধুর কণ্ঠ ও কাব্যপ্রতিভার কারণে তাঁকে ‘বুলবুল-এ-বাঙাল’ বা বাংলার বুলবুল উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছিল। ১৯৪৫ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত নন্দ কুমার দত্ত রোডের সেই বিখ্যাত মোশায়েরা বা কবিতা পাঠের আসরগুলো ছিল ঢাকার বুদ্ধিবৃত্তিক ও আধ্যাত্মিক চর্চার প্রাণকেন্দ্র।
সময়ের বিবর্তনে আধুনিক ঢাকার বুক থেকে সুফি ঐতিহ্যের সেই জৌলুস আজ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। প্রযুক্তির দাপটে মানুষ যখন আত্মিক সংযোগ হারিয়ে ফেলছে এবং অনেক ঐতিহাসিক দরবার যখন সময়ের স্রোতে অনেকটা থমকে গিয়েছে, সেখানে বকশীবাজার খানকাহ এক জীবন্ত ও প্রাণবন্ত ব্যতিক্রম। পাকিস্তান আমল থেকে শুরু হওয়া জাঁকজমকপূর্ণ ধর্মীয় সুফি আসরগুলো আজও এখানে বিন্দুমাত্র ম্লান হয়নি। বিশেষ করে বর্তমান গদ্দীনশীন শাহ সুফি সাঈদ আনওয়ার মোবারকীর একান্ত উদ্যোগ ও নিষ্ঠা এক কথায় বিস্ময়কর। আজকের এই যান্ত্রিক শহরে এমন দরবার খুঁজে পাওয়া ভার, যেখানে ব্যক্তিগত উদ্যোগে ও নিজস্ব তহবিল থেকে বিশাল খরচ বহন করে নিয়মিত অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। প্রতিদিন ৫০০০ বার দরুদ পাঠ এবং মাসিক ‘গিয়ারবী শরীফ’-এর মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষকে বিনামূল্যে খাওয়ানোর পাশাপাশি সুফি ঐতিহ্যকে তার স্বকীয়তায় টিকিয়ে রাখা বর্তমান প্রেক্ষাপটে এক বিশাল ও বিরল দৃষ্টান্ত।
আমার দেখা এই খানকাহর পরিবেশে আজও সেই হাফেজ জহুরুল হক মোবারকী (রহ.)-এর রেখে যাওয়া রুহানি প্রশান্তি খুঁজে পাওয়া যায়। এটি কেবল একটি সুফি প্রতিষ্ঠান নয়, বরং ১৯৪৭ থেকে বর্তমান পর্যন্ত বিস্তৃত ঢাকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তনের এক জীবন্ত সাক্ষী। ইতিহাস পাঠকদের জন্য এটি এক অনন্য গবেষণার কেন্দ্র, কারণ যেখানে অধিকাংশ ঐতিহাসিক দরবার আজ নীরব, সেখানে বকশীবাজার খানকাহ আজও তার আধ্যাত্মিক মশাল জ্বেলে ঢাকার প্রকৃত পরিচয়কে আগলে রেখেছে। হাফেজ জহুরুল হক মোবারকীর সেই ঐতিহ্যকে সাঈদ আনওয়ার মোবারকী যেভাবে বর্তমান প্রজন্মের কাছে জীবন্ত করে রেখেছেন, তা আমাদের জাতীয় স্বকীয়তা রক্ষার এক শক্তিশালী হাতিয়ার।