মোঃ আকরাম হোসেন রতন, নেত্রকোণা জেলা প্রতিনিধি:
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নেত্রকোণার পাহাড়ি এলাকায় বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের জীবন যেন প্রতিনিয়ত সংগ্রামের আরেক নাম। খাদ্যসংকট, সুপেয় পানির অভাব, ভূমির অনিশ্চয়তা, কর্মসংস্থানের সংকট ও পর্যাপ্ত সরকারি সুযোগ-সুবিধার অভাবে প্রতিনিয়ত নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে তাঁদের। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা পাহাড়ি জনপদে বসবাস করলেও এসব মানুষের জীবনে স্বস্তি ও নিরাপত্তার অভাব প্রকট।
নেত্রকোণা জেলার দুর্গাপুরসহ বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের রয়েছে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক ও উৎসব। তাঁদের জীবনযাত্রায় স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য থাকলেও জীবিকা নির্বাহের ক্ষেত্রে রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। একসময় পাহাড় ও বনকে কেন্দ্র করে তাঁদের জীবন-জীবিকা গড়ে উঠেছিল। প্রকৃতির ওপর নির্ভর করেই চলত তাঁদের দৈনন্দিন জীবন। কিন্তু সময়ের পরিবর্তন, বনজ সম্পদের হ্রাস এবং ভূমি নিয়ে অনিশ্চয়তা তাঁদের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
বাংলাদেশে বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো, ম্রো, সাঁওতাল, রাখাইন ও মণিপুরিসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনে রয়েছে বৈচিত্র্য। তাঁদের ঐতিহ্যবাহী উৎসব, পোশাক ও জীবনধারা দেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করেছে। তবে পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাসকারী এসব জনগোষ্ঠীর অনেকের জীবনেই অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও মৌলিক সেবার ঘাটতি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
খাদ্য সংগ্রহ ও জীবিকা নির্বাহে বাড়ছে দুর্ভোগ
পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে নারীরা পরিবারের খাদ্য সংগ্রহ ও জীবিকা নির্বাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁদের অনেককে খাদ্য সংগ্রহের জন্য বন-জঙ্গল ও পাহাড়ি ছড়ায় ঘুরে বেড়াতে হয়। সংগৃহীত ফলমূল ও অন্যান্য বনজ পণ্য বিক্রির জন্য ছুটতে হয় স্থানীয় বাজারে। কিন্তু প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া শাকসবজি, ফলমূল ও অন্যান্য পণ্যের দাম কমে যাওয়ায় তাঁদের পরিশ্রমের যথাযথ মূল্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এতে বাড়ছে অর্থনৈতিক ঝুঁকি ও পারিবারিক সংকট।
অন্যদিকে, পুরুষেরাও জীবিকা নির্বাহের জন্য দিন-রাত পরিশ্রম করছেন। তবুও অনেক পরিবারের খাদ্যসংকট পুরোপুরি দূর হচ্ছে না। প্রয়োজনীয় খাদ্য সংগ্রহের পাশাপাশি পরিবারের অন্যান্য চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে তাঁদের প্রতিনিয়ত কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
সুপেয় পানির সংকটও বড় সমস্যা
পাহাড়ি এলাকার মানুষের জন্য সুপেয় পানির সংকটও একটি গুরুতর সমস্যা। অনেক পাড়ায় পানির উৎস দূরে অবস্থিত হওয়ায় পানি সংগ্রহ করতে এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে যেতে হয়। জন্মের পর থেকেই অনেক মানুষকে পাহাড়ের উঁচু-নিচু পথ পাড়ি দিয়ে পানি সংগ্রহ করে জীবনযাপন করতে হচ্ছে।
পানি সংগ্রহে ব্যয় হওয়া সময় ও শ্রম তাঁদের দৈনন্দিন জীবনকে আরও কঠিন করে তুলছে। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের ওপর এর প্রভাব বেশি পড়ে। ফলে খাদ্যসংকটের পাশাপাশি নিরাপদ পানির অভাবও পাহাড়ি জনপদের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কর্মসংস্থানে অনিশ্চয়তা, বাড়ছে বেকারত্ব
একসময় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অনেক মানুষ বনজ সম্পদ সংগ্রহ, কৃষিকাজ ও জুমচাষের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। বর্তমানে তাঁদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ জীবিকার তাগিদে দেশের বিভিন্ন এলাকার তৈরি পোশাকশিল্পসহ অন্যান্য খাতে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। তবে কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা তাঁদের জীবনে নতুন সংকট তৈরি করেছে।
কর্মক্ষেত্রে ছাঁটাইয়ের কারণে অনেক শ্রমিক কাজ হারিয়ে গ্রামে ফিরে আসছেন। স্থায়ী কর্মসংস্থানের অভাবে তাঁদের অনেকে বেকার সময় পার করছেন। মালিকপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল অস্থায়ী চাকরির কারণে তাঁদের আয় ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।
এদিকে, পাহাড়ি এলাকার বনজঙ্গলও আগের মতো নেই। বনজ সম্পদ কমে যাওয়ায় প্রকৃতিনির্ভর মানুষের জীবিকা নির্বাহের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে। অন্যদিকে, বন বিভাগের বিধিনিষেধ এবং বিভিন্ন কোম্পানির ভূমি দখল নিয়ে উদ্বেগের কারণে জুমচাষিসহ বননির্ভর মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
ভূমির অধিকার ও বন সংরক্ষণ জরুরি
পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে ভূমির অধিকার নিশ্চিত করা এবং বনজ সম্পদ সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মৌজাভিত্তিক বন ব্যবস্থাপনা ও ভূমির অধিকার নিশ্চিত করা গেলে পাহাড় ও সমতলের বননির্ভর মানুষের খাদ্যসংকট মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বন ও বনজ সম্পদ সংরক্ষণ এবং বৃদ্ধিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব।
বন সংরক্ষণের পাশাপাশি পাহাড়ি এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা করা গেলে নেত্রকোনার পর্যটন সম্ভাবনাও আরও বিকশিত হতে পারে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পাহাড়ি পরিবেশ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা গেলে এ অঞ্চল পর্যটকদের কাছে আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে। তবে পর্যটন উন্নয়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ভূমির অধিকার, জীবিকা ও পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করাও জরুরি।
আবাসন ও সরকারি সুযোগ-সুবিধা নিয়ে উদ্বেগ
পাহাড়ি এলাকার কিছু জনগোষ্ঠীর জীবন এখনো প্রকৃতির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। তাঁদের অনেকেরই সুনিশ্চিত বসতভিটা ও স্থায়ী আবাসস্থল নেই। প্রতিবছর জুমচাষের জন্য এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে স্থানান্তরিত হতে হয় তাঁদের। ফলে স্থায়ীভাবে বসবাস ও প্রয়োজনীয় সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়।
নেত্রকোনার পাহাড়ি এলাকায় বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের জীবনযাত্রার এসব সমস্যা ও সংকটের কথা জানা গেছে। তাঁদের অভিযোগ ও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
সরকারের কার্যকর উদ্যোগের দাবি
পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মানুষও বাংলাদেশের নাগরিক। তাই নাগরিক হিসেবে তাঁদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। খাদ্য, সুপেয় পানি, নিরাপদ আবাসন, শিক্ষা, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাঁদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
এ জন্য নেত্রকোনা অঞ্চলের জনপ্রতিনিধি, সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও সরকারের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সচেতন মহল। তাঁদের মতে, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে বাস্তবসম্মত উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ, বিদ্যমান নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন এবং স্থানীয় মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও সংকট নিরসনে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে তাঁদের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। একই সঙ্গে তাঁদের অধিকার, মর্যাদা ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষার মাধ্যমে গড়ে তোলা সম্ভব একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বৈষম্যহীন সমাজ।