চিত্রশিল্পী মিলন বিশ্বাস
বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী এস. এম. সুলতানের ১০৩তম জন্মবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি
আজ ১০ আগস্ট বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী এস. এম. সুলতানের ১০৩তম জন্মবার্ষিকী। এই মহান শিল্পীর জন্মদিনে মোমবাতি প্রজ্বালন করে তাঁর প্রতিকৃতি অঙ্কনের মধ্য দিয়ে আমি, চিত্রশিল্পী মিলন বিশ্বাস, তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। একই সঙ্গে খুলনা আর্ট একাডেমি পরিবারের পক্ষ থেকে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। বাংলাদেশের চিত্রকলার ইতিহাসে এস. এম. সুলতান এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম। ১৯২৩ সালের ১০ আগস্ট নড়াইল জেলায় জন্মগ্রহণ করেন এই অসাধারণ শিল্পী। আবহমান বাংলার গ্রামীণ কৃষিজীবী মানুষের জীবন, শ্রম, সংগ্রাম ও প্রকৃতিকে তিনি তাঁর শিল্পের প্রধান বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর শিল্পকর্ম শুধু ছবি নয়; এর মধ্যে রয়েছে বাংলার মাটি, মানুষের শক্তি, কৃষকের ঘাম এবং আমাদের শিকড়ের গল্প। এ কারণেই তিনি শুধু একজন চিত্রশিল্পী নন তিনি ছিলেন একজন শিল্পদার্শনিক। শৈশব থেকেই তাঁর আঁকার প্রতি ছিল গভীর অনুরাগ। পরবর্তীতে কলকাতা আর্ট স্কুলে ভর্তি হলেও যুদ্ধ ও আর্থিক সংকটের কারণে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন সম্পূর্ণ হয়নি। কিন্তু প্রতিকূলতা তাঁর শিল্পসাধনাকে থামিয়ে দিতে পারেনি। নিজের প্রতিভা, অধ্যবসায়, জীবনবোধ এবং স্বতন্ত্র শিল্পভাষার মাধ্যমে তিনি অর্জন করেন দেশ-বিদেশে অসামান্য পরিচিতি।
এস. এম. সুলতানের চিত্রকর্মে গ্রামীণ জীবনের শক্তিমান কৃষক-শ্রমিক, প্রকৃতির বিশালতা, সবুজ-শ্যামল মাঠ এবং মানুষের শ্রমের মহিমা অনন্যভাবে ফুটে উঠেছে। তাঁর ক্যানভাসে কৃষক কখনো দুর্বল বা অসহায় নয়; বরং সে শক্তির প্রতীক, সৃষ্টির কারিগর এবং সভ্যতার নির্মাতা। বাংলার কৃষক ও মেহনতি মানুষকে তিনি যে মর্যাদায় তাঁর শিল্পে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তা তাঁকে শিল্পীদের শিল্পস্রষ্টা হিসেবে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮২ সালে তিনি একুশে পদক এবং ১৯৯৩ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হন। তবে পুরস্কার ও সম্মানের বাইরেও তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি ছিলেন মানুষের শিল্পী এবং শিশুদের প্রতি গভীরভাবে নিবেদিত একজন শিল্পসাধক। নড়াইলে শিশুদের জন্য ‘শিশু স্বর্গ’ ও চারুকলা শিক্ষার কার্যক্রমের মাধ্যমে তিনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতার পরিচয় দিয়েছেন। সুলতানের দর্শন থেকে আমার শিল্পযাত্রা
আমি, চিত্রশিল্পী মিলন বিশ্বাস, বরিশালে জন্মগ্রহণ করেছি। খুলনা আর্ট কলেজে পড়াশোনার সময় এস. এম. সুলতানের জীবন ও শিল্পদর্শনের সঙ্গে গভীরভাবে পরিচিত হই। তাঁর জীবনী পড়ে আমি ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত হই। মহান এই শিল্পীর সঙ্গে আমার সরাসরি দেখা হওয়ার সুযোগ হয়নি; কিন্তু তাঁর জীবন, শিল্পকর্ম ও দর্শন সম্পর্কে জানতে এবং তাঁর বাড়িতে গিয়ে যতটুকু জ্ঞান ও অনুপ্রেরণা অর্জন করেছি, তা আজও আমার শিল্পচর্চার অন্যতম শক্তি।
সুলতানের জীবন আমাকে একটি বিষয় গভীরভাবে ভাবিয়েছে একজন শিল্পীর প্রকৃত সাফল্য শুধু নিজের শিল্পকর্মে নয়, বরং পরবর্তী প্রজন্মের হাতে সেই শিল্পের আলো পৌঁছে দেওয়ার মধ্যেও নিহিত।
সেই ভাবনা থেকেই ছাত্রজীবনে শিশুদের নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা করি। প্রতিষ্ঠা করি ‘নিশাত আর্ট কোচিং’। পরবর্তীতে ২০০৮ সালে এর নাম পরিবর্তন করে রাখি ‘খুলনা আর্ট একাডেমি’। প্রথমদিকে এখানে শুধু ছবি আঁকার কার্যক্রম পরিচালিত হতো। পরে ২০১০ সালে শুরু হয় চারুকলা ভর্তি কোচিং কার্যক্রম।
শিশুদের গড়ে তোলাই আমাদের শিল্পসাধনা
দীর্ঘ পথচলায় আজ খুলনা আর্ট একাডেমি সফলতার ১৬ বছর অতিক্রম করেছে। এই সময়ে বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার সুযোগ পেয়েছে আমাদের ২৩০ জন শিক্ষার্থী। আমাদের অসংখ্য শিক্ষার্থী আজ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অনেক শিক্ষার্থী জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কার অর্জন করেছে এবং দেশসেরা সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছে। একজন শিক্ষক ও শিল্পী হিসেবে এর চেয়ে বড় আনন্দ আর কী হতে পারে! আমার কাছে একজন শিল্পীর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে তাঁর শিক্ষার্থীদের অর্জনের ওপর। একজন শিক্ষক যদি নিজের অর্জিত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও সৃজনশীলতা নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিতে পারেন, তবেই তাঁর শিল্পসাধনা পূর্ণতা পায়। সেই বিশ্বাস থেকেই আমরা সর্বোচ্চ আন্তরিকতা দিয়ে শিশুদের গড়ে তোলার চেষ্টা করি।নবীন চারুশিল্পীদের পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করতে গিয়ে আমিও বিভিন্ন সময় সম্মাননা স্মারক গ্রহণের সুযোগ পেয়েছি। আমার শিল্প ও শিক্ষামূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে যমুনা টিভি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছে। এ ধরনের স্বীকৃতি ও ভালোবাসার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আমি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। গ্রাম থেকে শিল্পের পথে গ্রাম থেকে উঠে এসে আজ আমি একজন চিত্রশিল্পী এটাই আমার জীবনের অন্যতম বড় প্রাপ্তি। শৈশব থেকেই আমি বিশ্বাস করি“আজকের শিশু, আগামী দিনের ভবিষ্যৎ।”এই বিশ্বাসকে সামনে রেখে শিশুদের সৃজনশীল বিকাশে কাজ করে যেতে চাই। কারণ একটি শিশুর হাতে যখন রং-তুলি তুলে দেওয়া হয়, তখন শুধু একটি ছবি আঁকা হয় না; তার কল্পনা, মনন, সৌন্দর্যবোধ ও মানবিক মূল্যবোধেরও বিকাশ ঘটে।এস. এম. সুলতান তাঁর জীবন দিয়ে আমাদের শিখিয়েছেন শিল্প মানুষের জন্য, শিল্প মাটির জন্য, শিল্প ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য। তাঁর সেই দর্শনকে হৃদয়ে ধারণ করেই আমার শিল্পচর্চা ও শিশুদের নিয়ে পথচলা। আজ তাঁর জন্মদিনে আমি শুধু তাঁর প্রতিকৃতিতে মোমবাতি জ্বালিয়ে শ্রদ্ধা জানাচ্ছি না; তাঁর আদর্শ ও শিল্পদর্শনকে আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অঙ্গীকারও করছি। মহান শিল্পী এস. এম. সুলতান আমাদের মাঝে তাঁর শিল্পকর্মের মধ্য দিয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবেন। তাঁর দেখানো পথ আমাদের শিল্পচর্চাকে আরও সমৃদ্ধ করুক, আমাদের শিশুরা তাঁর মতো করে বাংলার মাটি, মানুষ ও প্রকৃতিকে ভালোবাসতে শিখুক এই হোক আজকের দিনে আমার প্রার্থনা।
মহান শিল্পী এস. এম. সুলতানের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
সকল শিশুর প্রতি রইল অশেষ ভালোবাসা ও শুভেচ্ছা।