মোঃ আবু সাঈদ, স্টাফ রিপোর্টারঃ
দেশজুড়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে গ্যাস সংকট। সরবরাহ ঘাটতি ও নিম্ন চাপের কারণে একদিকে থমকে গেছে শিল্পকারখানার চাকা, অন্যদিকে সিএনজি স্টেশন থেকে শুরু করে গৃহস্থালির রান্নাঘর— সর্বত্রই ছড়িয়ে পড়েছে চরম জনদুর্ভোগ। রাজধানী ঢাকা, বন্দরনগরী চট্টগ্রাম, টাঙ্গাইল ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ দেশের প্রধান প্রধান অঞ্চলগুলোতে এখন গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি তলানিতে এসে ঠেকেছে।
উৎপাদন বিপর্যয়ে শিল্পখাত:
গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি শিল্পখাতে। বিশেষ করে গ্যাসনির্ভর টেক্সটাইল, তৈরি পোশাক, ডাইং, প্রিন্টিং ও ফিনিশিং কারখানাগুলোতে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় অধিকাংশ কারখানা তাদের পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারছে না। অনেক প্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে উৎপাদন অর্ধেকে নামিয়ে এনেছে, আবার কোথাও কোথাও কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হচ্ছেন মালিকেরা। এতে করে সময়মতো রফতানি আদেশ সরবরাহ করা নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা, যা দেশের সার্বিক অর্থনীতিকে বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলছে।
রান্নাঘরে হাহাকার, নাভিশ্বাস বাসাবাড়িতে:
শিল্পখাতের পাশাপাশি চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন আবাসিক গ্রাহকরা। রাজধানীর উত্তরা, ধানমন্ডি, মিরপুরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তিক এলাকায় গৃহস্থালির গ্যাসের চাপ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। চট্টগ্রামের একাধিক এলাকায় আবাসিক লাইনে গ্যাসের চাপ শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। ফলে ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চুলা না জ্বলায় স্বাভাবিক রান্নাবান্না বন্ধ হয়ে গেছে। বিকল্প হিসেবে মাটির চুলা, কেরোসিনের স্টোভ কিংবা বাড়তি খরচ করে এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
পরিবহন খাতে অচলাবস্থা, সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ সারি:
গ্যাস সংকটের নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে পরিবহন খাতেও। রাজধানীর উত্তরা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন স্থানে অধিকাংশ সিএনজি ফিলিং স্টেশনে পর্যাপ্ত সরবরাহ নেই। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তীব্র সংকটের কারণে প্রায় সবকটি ফিলিং স্টেশন সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার খবর পাওয়া গেছে। ফলে গ্যাস পাওয়ার আশায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত জ্বালানি। এতে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও বাস চলাচল কমে যাওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরা, গুনতে হচ্ছে বাড়তি ভাড়াও।
উৎস ও কাঠামোগত দুর্বলতা:
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও খাতসংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন অনুযায়ী, দীর্ঘদিনের চাহিদা ও জোগানের অসম ব্যবধান, দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন হ্রাস এবং আমদানিকৃত এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) সরবরাহে প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সীমাবদ্ধতাই এই সংকটের মূল কারণ। সম্প্রতি সংকট কাটাতে এলএনজি টার্মিনাল থেকে সরবরাহ বাড়ানোর কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবে তার সুফল এখনো সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছায়নি।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা ও আশু সমাধানের দাবি:
সংকট দ্রুত নিরসন না হলে শিল্প উৎপাদন, দূরপাল্লার পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ চেইনে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। শিল্প উদ্যোক্তা, গাড়িচালক ও সাধারণ নাগরিকেদের দাবি— শুধু সাময়িক আশ্বাস নয়, দেশের অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও জনদুর্ভোগ কাটাতে দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে তাত্ক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।