সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি:
সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলায় একই পরিবারে তিন প্রতিবন্ধী শিশুকে নিয়ে চরম বিপাকে রয়েছেন কাঠমিস্ত্রী স্বাধীন সূত্রধর। এক হাতে সংসারের বোঝা, অন্য হাতে তিন প্রতিবন্ধী সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাদের।
অন্যের বাড়িতে কাঠমিস্ত্রির কাজ করে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় করেন তিন প্রতিবন্ধীর বাবা স্বাধীন সূত্রধর। সেই সামান্য আয় দিয়েই অনাহারে-অর্ধাহারে চলে তার পাঁচ সদস্যের সংসার। সংসারে এত অভাব-অনটন থাকার পরও তাদের মা শ্রীমতি সূত্রধরের তিন সন্তানের দেখাশোনা করতে গিয়ে ঘরের বাইরে কাজ করার সুযোগ নেই। তিন সন্তানের দেখাশোনা, চিকিৎসা, পরিচর্যা ও দৈনন্দিন ঘরের প্রয়োজন মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে শ্রীমতি সূত্রধরকে।
এর মধ্যে দুই সন্তান প্রতিবন্ধী ভাতা পেলেও ১৫ বছর বয়সী মেয়ে সৃষ্টি সূত্রধর এখনো ভাতা পাচ্ছে না। তবে পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছে জেলা ও উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়। আপাতত তিনটি হুইলচেয়ার দেওয়া এবং সৃষ্টির ভাতা দ্রুত চালুর উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক নিবাস রঞ্জন দাশ।
ঘটনাটি হাওরের জেলা সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার চাকুয়া গ্রামের।
পিতা স্বাধীন সূত্রধরের তিন প্রতিবন্ধী সন্তান হচ্ছেন সঞ্জীব সূত্রধর (১৮), সৃষ্টি সূত্রধর (১৫) ও সমাপ্ত সূত্রধর (১২)। তারা তিনজনই জন্মসূত্রে প্রতিবন্ধী।
পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি হচ্ছেন স্বাধীন সূত্রধর। তিনি পেশায় একজন কাঠমিস্ত্রী। প্রতিদিন পরিবারের ৫ জন সদস্যের দুবেলা দুমুঠো খাবারের আশায় অন্যের বাড়িতে কাঠমিস্ত্রির কাজ করতে হয় তাকে। প্রতিদিন তার হাড়ভাঙা পরিশ্রমের যৎসামান্য যে টাকা আয় করেন, তা দিয়েই কোনো রকমে চলে ৫ জনের পরিবারে টানাপোড়েনের সংসার।
সন্তানদের সার্বক্ষণিক দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে স্ত্রী শ্রীমতী সূত্রধরের পক্ষে বাইরে গিয়ে কাজ করা সম্ভব হয় না। ফলে সংসারের খরচ ও সন্তানদের প্রয়োজন মেটাতে প্রতিদিনই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে পরিবারটিকে।
এ ব্যাপারে প্রতিবন্ধী তিন সন্তানের পিতা স্বাধীন সূত্রধর কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার পরিবারে তিনটি সন্তান তাও প্রতিবন্ধী, তাদের ভরণপোষণ আর অভাব-অনটন আর টানাপোড়েনের সংসারে আমার একার পক্ষে চলাই যেন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, আমার বড় ছেলেটি অন্তত সুস্থ থাকলে হয়তো এই বয়সে সংসারের হাল ধরতে পারত।
তিনি বলেন, মানুষের বাড়িতে কাঠমিস্ত্রির কাজ করে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা যে পাই সেই টাকায় বর্তমান বাস্তবতায় সংসার চালানো খুবই কষ্টকর। আমার সন্তানদের দেখাশোনা করেন আমার স্ত্রী। এদের রেখে আমার স্ত্রী কোনো কাজও করতে পারে না। আমার বড় ছেলে ও ছোট মেয়ে প্রতিবন্ধী ভাতা পায়, কিন্তু মেঝো মেয়েটা এখনো সরকারি ভাতা পায়নি।
এ ব্যাপারে প্রতিবন্ধী তিন সন্তানের মা শ্রীমতী সূত্রধর বলেন, আমার সারাদিন যায় এদের দেখাশোনা করায়। এদের বাথরুমে আনা-নেওয়া, গোসল করানো থেকে শুরু করে খাওয়া-দাওয়া ইত্যাদিতেই সারাদিন চলে যায়। এদের রেখে বাইরে গিয়ে সংসারের জন্য কোনো কাজ করতে পারি না। তিনি সরকারের কাছে তার তিন প্রতিবন্ধী সন্তানের চিকিৎসা, আর্থিক সহায়তা ও পুনর্বাসনের দাবি জানান।
এ ব্যাপারে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য সুনীল চন্দ্র দাস জানান, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ইতিমধ্যে সমাজসেবা কার্যালয়ে যোগাযোগ করে পরিবারের দুই সন্তানকে প্রতিবন্ধী ভাতার আওতায় আনতে সক্ষম হয়েছেন এবং অপর সন্তান সৃষ্টির জন্যও আবেদন করা হয়েছে।
এ বিষয়ে শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রিয়াস চন্দ্র দাস বলেন, উপজেলা প্রশাসন থেকে এমন কিছু দেওয়ার মতো সুযোগ-সুবিধা নেই। তবে সমাজসেবা থেকে ভাতা পেতে পারে। তারপরও আমরা দেখব, কিছু করা যায় কিনা।
এ ব্যাপারে সুনামগঞ্জ সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক নিবাস রঞ্জন দাস বলেন, আপাতত তিনটি হুইলচেয়ারের ব্যবস্থা করা হবে। তিনি আশ্বাস দিয়ে বলেন, সরকারের সমাজসেবা মন্ত্রণালয় সমাজের এমন অসহায় ও প্রতিবন্ধী মানুষদের কল্যাণে কাজ করে থাকে।