এম বাদল খন্দকার, বিশেষ প্রতিনিধি:
মাদকের বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন। এলাকার তরুণ সমাজকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন। এটাই কি ছিল নেত্রকোনার সাংবাদিক লুৎফুজ্জামানের অপরাধ? আজ এই প্রশ্ন শুধু নেত্রকোনার নয়, সারা বাংলাদেশের বিবেকবান মানুষের।
একজন সাংবাদিক যখন মাদক কারবারি, চাঁদাবাজ, ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে লেখেন, তখন তার জীবন হয়ে ওঠে হুমকির মুখে। লুৎফুজ্জামান তার জ্বলন্ত উদাহরণ। তিনি কারো জমি দখল করেননি, কারো টাকা মেরে খাননি — শুধু সত্য লিখেছিলেন। আর সেই সত্য লেখাই আজ তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই দেশে সাংবাদিক হত্যার বিচার হয় না — সাগর-রুনি তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারে নিজ বাসায় খুন হন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার ও এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি। ১৪ বছর পেরিয়ে গেছে, তদন্তের সময় পেছানো হয়েছে ১১৩ বারের বেশি, কিন্তু চার্জশিট আজও আলোর মুখ দেখেনি। যদি দেশের সবচেয়ে আলোচিত সাংবাদিক হত্যারই বিচার না হয়, তাহলে মফস্বলের একজন লুৎফুজ্জামানের নিরাপত্তা কোথায়?
অভিজ্ঞতা বলে, এই দেশে যে ঘুষখোর,ভূমি দৃশ্য, দুর্নীতিবাজ তাদের কাছেই সাংবাদিকরা শত্রু হয়ে যায়। কারণ সাংবাদিক মানেই প্রশ্ন, সাংবাদিক মানেই জবাবদিহিতা। একজন সাংবাদিক যখন প্রশ্ন করেন — কোথায় গেল বরাদ্দের টাকা? কে দিচ্ছে মাদকের চালান? তখনই তিনি হয়ে যান চক্ষুশূল।
দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোরা ভাবে, সাংবাদিক থাকলে তাদের দুর্নীতি, অনিয়ম, ব্যর্থতা প্রকাশ পাবে। তাই সাংবাদিকদের মুখ বন্ধ রাখাই যেন তাদের কাছে নিরাপদ। সাংবাদিকের উপর হামলা হলে মামলা হয় না, মামলা হলেও তদন্ত হয় না, তদন্ত হলেও বিচার হয় না। এই বিচারহীনতার সুযোগ নিয়েই আজ মাদক কারবারিরা সাংবাদিকদের গলা টিপে ধরতে চায়।
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে বাংলাদেশে ৫০ জনের বেশি সাংবাদিক হত্যা ও গুরুতর নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৯০% ঘটনারই বিচার হয়নি। প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে বাংলাদেশের অবস্থান প্রতিবছর নিচে নামছে, যা আমাদের জন্য লজ্জার।
আমরা কোনো দয়া চাই না, আমরা সুবিচার চাই।
১. নেত্রকোনার সাংবাদিক লুৎফুজ্জামানের উপর হামলাকারী ও মাদক কারবারিদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।
২. সাগর-রুনি হত্যার দ্রুত বিচার ও চার্জশিট প্রকাশ চাই।
৩. সারাদেশে সাংবাদিক সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করতে হবে।
৪. মফস্বল সাংবাদিকদের নিরাপত্তায় পুলিশকে জিরো টলারেন্স নীতি নিতে হবে।
মনে রাখতে হবে, সাংবাদিকদের কলম থেমে গেলে রাষ্ট্র অন্ধ হয়ে যায়। সাংবাদিকরা কারো শত্রু নয়, তারা রাষ্ট্রের আয়না। আয়না ভেঙে ফেললে নিজের ক্ষতবিক্ষত চেহারাটাই একদিন দেখতে পাবেন না।
সত্যের পক্ষে কলম চলবেই। লুৎফুজ্জামানরা একা নন, তাদের পাশে সারা দেশের বিবেকবান মানুষ আছে। আমরা বিচার চাই, আজই চাই।