হারাধন সূত্রধর, পূর্বধলা (নেত্রকোনা) প্রতিনিধি:
বর্ষা শেষে নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জলরাশি ধীরে ধীরে শুকিয়ে জেগে ওঠে সবুজ প্রান্তর। কোথাও সবুজ ঘাস, কোথাও সোনালি ধানের সমারোহ। হাওরের পানিতে ও মাটিতে টিকে থাকা হিজল-করচের সারি প্রকৃতিকে দেয় ভিন্ন এক সৌন্দর্য। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালেই রয়েছে কৃষকের দীর্ঘ অপেক্ষা, ঋণের বোঝা এবং একমাত্র বোরো ফসল ঘরে তোলার অনিশ্চয়তা।
নেত্রকোনার মদন, মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুরীসহ হাওরবেষ্টিত সাত উপজেলার বহু কৃষক বছরের প্রধান জীবিকা হিসেবে বোরো ধানের ওপর নির্ভরশীল। এই একটি ফসল ঘরে উঠলেই মেটে সারা বছরের সংসার খরচ, পরিশোধ করা হয় কৃষিঋণ ও মহাজনের দেনা, সন্তানদের লেখাপড়া এবং পরবর্তী মৌসুমের প্রস্তুতি। ফলে বোরো ধানের ভালো ফলন তাদের কাছে শুধু কৃষি উৎপাদন নয়—সারা বছরের বেঁচে থাকার অবলম্বন।
কিন্তু সেই একমাত্র ফসলের পথজুড়েই থাকে আগাম বন্যা, অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও ফসলরক্ষা বাঁধ নিয়ে শঙ্কা। নির্ধারিত সময়ের আগে পানি বাড়লে কিংবা বাঁধ ভেঙে গেলে কয়েক মাসের পরিশ্রম মুহূর্তেই পানির নিচে চলে যেতে পারে। আর এক মৌসুমের ফসলহানি হাওরের একটি পরিবারের অর্থনৈতিক হিসাবকে এলোমেলো করে দিতে পারে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিভিন্ন সময়ের তথ্য অনুযায়ী, নেত্রকোনায় ছোট-বড় ১৩৪টি হাওর রয়েছে। হাওরাঞ্চলের বোরো ফসল রক্ষায় রয়েছে শত শত কিলোমিটার ডুবন্ত অস্থায়ী বাঁধ। এসব বাঁধের ওপর হাজার হাজার হেক্টর জমির বোরো ফসল নির্ভরশীল। ২০২৬ সালেও ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়েছে।
তবু আগাম বন্যার ভয় কাটেনি কৃষকের। চলতি বছরের এপ্রিল-মে মাসে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে জেলার বিভিন্ন এলাকায় আধাপাকা ও পাকা বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক হিসাবে, প্রায় ২২ হাজার ৩৪৮ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং প্রায় ৬৯ হাজার ৬৯৮ জন কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েন; ক্ষতির বাজারমূল্য ধরা হয় প্রায় ৩১৩ কোটি টাকা। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ক্ষতির পরিমাণে ভিন্নতা পাওয়া গেছে।
মদনের গণেশের হাওর, আটপাড়ার সুমাইখালীসহ খালিয়াজুরী ও মোহনগঞ্জের বিভিন্ন হাওরে পানিতে তলিয়ে যায় বোরো ধান। কোথাও হাঁটুসমান পানিতে দাঁড়িয়ে কৃষককে ধান কাটতে হয়েছে। আবার কাটা ধান নৌকায় তুলে নিতে হয়েছে অপেক্ষাকৃত উঁচু জায়গায়। ধান কাটার এই কঠিন সময়ে শ্রমিক সংকটও কৃষকের দুর্ভোগ বাড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে নারী ও পরিবারের অন্য সদস্যরাও ধান কাটার কাজে যুক্ত হয়েছেন।
খালিয়াজুরীর কৃষক মোঃ কালা চান মিয়া ও গঙ্গা চরণ, বলেন, “হাওরের কৃষকরা একটি মাত্র ফসলের ওপর নির্ভর করে থাকি। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসলহানি হলে আমাদের আরেকটি বছরের জন্য ভালো ফলনের অপেক্ষায় থাকতে হয়। আগাম বন্যায় ফসলহানির আশঙ্কা আমাদের পিছু ছাড়ে না।”
কৃষকের আরেকটি বড় সংকট তৈরি হয় হাওরের পানি নামতে দেরি হলে। বর্ষার পরও অনেক ডোবা ও নিচু জমিতে পানি জমে থাকায় সময়মতো বীজতলা তৈরি করা যায় না। এতে বোরো আবাদ পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, মাঠপর্যায়ে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে এবং ইরি-বোরো চাষে আধুনিক কৃষিপদ্ধতি ব্যবহারে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
নেত্রকোনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, হাওরাঞ্চলে বর্ষা শেষে বোরো আবাদের প্রস্তুতি শুরু হয়। কৃষকেরা জমি তৈরি, সার প্রয়োগ ও চারা রোপণে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
তবে শুধু বাঁধ নির্মাণ করলেই হাওরের কৃষকের অনিশ্চয়তা দূর হচ্ছে না। হাওরের পানি দ্রুত নিষ্কাশন, খাল-বিলের নাব্যতা রক্ষা, জলকপাট সচল রাখা, সময়মতো বাঁধ নির্মাণ এবং দুর্যোগের আগেই ধান কাটার সুযোগ তৈরি—এসব বিষয়ও কৃষকের নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে পানি চলাচলের পথ পলি জমে বন্ধ হওয়া ও কিছু জলকপাট অকেজো থাকার কথাও উঠে এসেছে।
হাওরের কৃষকের কাছে বোরো ধান তাই কেবল একটি ফসল নয়; এটি পরিবারের খাদ্য, সন্তানের পড়াশোনা, ঋণ পরিশোধ এবং পরবর্তী বছরের স্বপ্নের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একমাত্র বড় অবলম্বন। ফলে আগাম বন্যার পূর্বাভাস, টেকসই ফসলরক্ষা বাঁধ, দ্রুত পানি নিষ্কাশন এবং সময়মতো ধান কাটার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে হাওরের কৃষকের দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা অনেকটাই কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।