মোঃ আল আমিন, হোসেনপুর (কিশোরগঞ্জ)প্রতিনিধি
গ্রাম বাংলার গৃহবধুদের কন্ঠে আগে শোনা যেত “ও বউ ধান ভানেরে ঢেঁকিতে পার দিয়া, ঢেঁকি নাচে আমি নাচি হেলিয়া দুলিয়া” গানের সুর আর ঢেঁকির টিপ টিপ শব্দ যেন ছিল শত ক্লান্তির মাঝেও হৃদয় ভরা বিনোদন। কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরে অনাদিকালের এই ঐতিহ্য আজ বিলুপ্তির পথে। সূত্র মতে ঢেঁকি হচ্ছে লোকজ ঐতিহ্যের সাথে জড়িত ধান বা চাল মাড়াইয়ে ব্যবহৃত কাঠের তৈরী যন্ত্র বিশেষ। ঢেঁকি দ্বারা চাউল, ধান, চিড়া, ডাল ও হলুদ মরিচ সহ বিভিন্ন মসলা গুরা করা হয়। উপজেলার কুড়িমারা গ্রামের দুলাল মিয়া, আমেনা বেগম ও হাছুনির মা সহ অনেকেই জানান, ঢেঁকিতে ধান ভাঙতেন গ্রামের বৌ-ঝিরা তাদের সাথে যোগ দিতেন পাড়ার কিশোরীরাও। গ্রাম্য বধুরা ঢেঁকি চলার তালে তালে তাদের বাপ-দাদার আমলের গীত গেয়ে বিনোদনের মাধ্যমে এ পরিশ্রমের কাজটি করতেন। উপজেলার সাহেবেরচর গ্রামের লোকজ সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক ফরিদ উদ্দিন জানান, এক সময়ের ঐতিহ্যবাহী সেই ঢেঁকি আজ বিলুপ্ত প্রায়। গ্রাম বাংলার প্রতিটি গ্রামে আশির দশকে ঢেঁকির ব্যবহার ছিলো চোখে পড়ার মতো। সেটি আজ অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে ইঞ্জিনচালিত মেশিন ব্যবহারে। বর্তমান যান্ত্রিকতার যুগে এই চিরচেনা ঐতিহ্য যেন প্রায়ই হারিয়ে গেছে। তখনকার সময়ে মেশিনের প্রচলন না থাকায় উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে প্রায় সকল বাড়িতেই ঢেঁকিই ছিল একমাত্র অবলম্বন। কিন্তুু এখন আর তেমন চোখে পড়েনা। যদিওবা দু-একটা দেখাযায় তাও অযতেœ অবহেলায় আছে উঠানের কোণে। যা বসতি করে নিয়েছে উইপোকারা। হয়তো কিছুদিন পড়ে কোথাও আর খুজে পাওয়া যাবেনা।
বাড়িতে অতিথি এলে চাল কুটার তোড়জোর শুরু হতো। তারপর গভীর রাত অবধি চলতো রকমারি পিঠা বানানো আর সকাল বেলা খাওয়ার মাজাদার আমেজ। ঢেঁকি ছাঁটা চালের ভাত, পোলাও খির আর ফিরনী ছিলা অত্যন্ত সুস্বাদু। উপজেলার সাহেবেরচর গ্রামের বাহার উদ্দি, খলিল মিয়ার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তিনি ঐতিহ্য হিসেবে সংরক্ষণ করে রেখেছেন ঢেঁকি। জানা যায়, ঢেঁকিতে কোটা চিড়া আর চালের গুড়োর পিঠার কোন জুড়ি ছিল না। অন্যদিকে ঢেঁকিতে ভাঙানো চালে প্রচুর ভিটামিন রয়েছে বলে চিকিৎসকরা রোগীকে তা খাওয়ানের পরামর্শ দিতেন। এখন ঢেঁকির পরিবর্তে ধান ভাঙ্গার আধুনিক রাইসমিল বা অটোমিলে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিদ্যুৎ চালিত মেশিন ছাড়াও ডিজেল চালিত স্যালো মেশিনের রাইসমিল ভ্রাম্যমাণ ভ্যান গাড়িতে নিয়ে বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে ধান মাড়াই করা হয়। আধুনিক যান্ত্রিক যুগে স্থানীয় গৃহবধুদের কষ্ট অবশ্য লাঘব হয়েছে কিন্তু বিলিন হয়ে যাচ্ছে সুনিপুণ ঐতিহ্যের ধারক-বাহক। অন্যদিকে স্বাদেরও হয়েছে সমাধি বলে মনে করেন সচেতন মহল।