লেখাটির শিরোনাম পড়ে মনে হতে পারে, সম্প্রতি নিহত বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র আজমল হোসেন এর মৃত্যু পরবর্তী আইনী প্রক্রিয়ায় করা ময়না তদন্ত নিয়ে কথা বলতে যাচ্ছি। নাহ্ বিষয়টি মোটেই সেরকম না। তবে ঘটনা পরবর্তী পর্যবেক্ষণে মাথায় বিভিন্ন রকমের প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে। একেক বার একেকটি ময়নাতদন্ত রিপোর্ট চোখের সামনে ভাসছে। শুধু আইনজীবী হিসেবে নয়, একজন সচেতন মানুষ হিসেবেও কোনো প্রশ্নের উত্তরই মেলাতে পারছি না। বলা হচ্ছে,
১। ভাত চুরির অভিযোগে আজমুলকে দু একটা চড়- থাপ্পড় মারা হয়েছে, পরবর্তীতে চারতলা ভবনের ছাদে নিয়ে যাওয়া হলে সেখান থেকে লাফ দিলে আজমুল মারা যান। প্রশ্ন হচ্ছে, ঘটনা পরংপরায় এই বক্তব্য কতটা যৌক্তিক? আর আজমুল যদি চারতলার ওপর থেকে লাফ দিয়ে থাকেন কেন লাফ দিলেন? তিনি কি মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন? নাকি অত্যাচারের মাত্রা এতবেশী ছিল যে আজমুল কিংকর্তব্য বিমুঢ় হয়ে পড়েছিলেন? নাকি ঠেলে ফেলে দেওয়া হয়েছিল? ধোঁয়াশা শুধুই ধোঁয়াশা।
২। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখা গেল, আজমুল যে মেসে থাকতেন, সেখানে খেতে হলে আগেই জানাতে হয়। আজমুল আগে জানাননি বলে তার খাবার রান্না হয়নি। আজমুলের অনেক ক্ষুধা পাওয়ায়, সে অন্য জনের খাবার খেয়ে নিয়েছেন। তর্কের খাতিরে এটাকে যদি সত্য ধরেও নিই। প্রশ্ন হচ্ছে, মোটামুটি স্বচ্ছল পরিবারের, বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া একজন শিক্ষার্থী এতই অভাবগ্রস্থ বা এতই ব্যক্তিত্বহীন যে, অন্যজনের ভাত চুরি করে খাবেন? যদি এমনটি হয় যে, সরল মনে রুমমেইটের খাবার খেয়ে ফেলেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া সব শিক্ষার্থীদের আবাসস্থলে আরেকজন শিক্ষার্থীকে এমনভাবে চোর সাবস্ত করে শুধুমাত্র চড়-থাপ্পড়ও দেওয়া হয়, খুবই দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া এমন শিক্ষার্থীদেরকে কোন শ্রেণির মধ্যে ফেলা উচিৎ আমার অন্তত বোধগম্য নয়। একটি ভিডিওতে দেখলাম একজন শিক্ষার্থী বলছেন, আজমুল আমাদের মেসে খেতেন না। তার মানে ওই শিক্ষার্থী বলতে চেয়েছেন, আজমুল নিজের মেসে নয়, অন্য মেসে যেয়ে খাবার চুরি করেছেন। কি অদ্ভুত অভিযোগ আর কি অদ্ভুত মানহানি! এরাই আমাদের গর্বের ধন, বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থ। তাহলে কি আজমুল পাগল ছিলন? এহেন কান্ড ঘটিয়ে বসলেন? নাহ্ আজমুল পাগল ছিলেন এমনও কোনো প্রমাণ মিলছে না।
৩। আজমুলের বাবা বলেছেন, আজমুল চোর সাব্যস্ত হওয়ায় তার নিকট ফোন করে ১লক্ষ টাকা দাবী করা হয়েছিল। তাহলে এটা কি মুক্তিপণ নাকি চাঁদাবাজি প্রশ্ন থেকেই যায়।
৪। পুলিশ বলছে গণপিটুনি (দায়সারার সাধারণ উক্তি)
৫। প্রতক্ষদর্শীরা বলছেন, আজমুলের শরীরের বিভিন্ন স্থানে মারাত্মক জখম। তার বাবা বলছেন আজমুলের দুটি পা ভাঙ্গা।
প্রশ্ন হচ্ছে, এটি কি নিছকই ভাতচুরি? মব? গণপিটুনি? নাকি পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকান্ড? নাকি চাঁদা বা মুক্তিপণ না পাওয়ায় হত্যাকান্ড? নাকি অন্য কিছু? মোটিভ উদঘাটনের দায় আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর।
তবে ঘটনা যা-ই হোক, আজমুল মারা গেছেন একদল বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের চরম নির্যাতনের মুখে। তাহলে বিবেক কোথায়? নিরাপদ কোথায়? নিরাপত্তা কোথায়?
হত্যার শিকার শিশু অপ্রতিমের বাবা- মা তাদের সন্তান হারিয়ে মারাত্মক শোকাতুর অবস্থায় যা বলেছেন বা বলতে বাধ্য হয়েছেন, আর কিছু বলতে বাকী আছে বলে মনে হয় না।
তাহলে কি এভাবে বাবা-মায়ের বুক খালি হতেই থাকবে? আর দায়িত্বশীলরা শুধু বুলি আওড়াতেই থাকবেন?
রসাতলে যাওয়ার আর কত বাকী? আর কত আজমলুদের ময়নাতদন্ত আমার মতো এমন অনেকের কাছে ধোঁয়াশাই থেকে যাবে?