আলহাজ্ব এম.এ. ইউসূফ
বাঙালি জাতির ইতিহাসে ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ এক অবিস্মরণীয় দিন। দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র সংগ্রাম, ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগ এবং ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত হয় আমাদের মহান স্বাধীনতা। ২০২৬ সালে এসে বাংলাদেশ তার স্বাধীনতার ৫৫ বছর পূর্ণ করেছে। সাড়ে পাঁচ দশকের এই পথপরিক্রমা একটি জাতির জন্য কম সময় নয়। এই দীর্ঘ সময়ে আমাদের অর্জন যেমন বিশাল, তেমনি ব্যর্থতা বা অপূর্ণতার তালিকাও ছোট নয়। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পূর্তির এই মাহেন্দ্রক্ষণে দাঁড়িয়ে আমাদের আত্মোপলব্ধি, মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনার মূল্যায়ন এবং জাতীয় জীবনের অপূর্ণ প্রত্যাশাগুলো খতিয়ে দেখা অত্যন্ত জরুরি।
স্বাধীনতার পটভূমি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা
বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। এটি ছিল ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬-এর ছয় দফা, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ৭০-এর সাধারণ নির্বাচনের ধারাবাহিক ফসল।
মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ছিল একটি অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক এবং বৈষম্যহীন সমাজ ও রাষ্ট্র গঠন। ১৯৭১ সালের ১০ই এপ্রিল ঘোষিত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে তিনটি মূল নীতির কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল—’সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার’। এই তিন স্তম্ভই ছিল মুক্তিযুদ্ধের মূল চালিকাশক্তি, যা প্রতিটি বাঙালিকে নিজের জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
৫৫ বছরে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অর্জন
স্বাধীনতার ৫৫ বছরে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। ১৯৭১ সালে শূন্য হাতে যাত্রা শুরু করে আজ বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে একটি উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি: যুদ্ধবিধ্বস্ত ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র অপবাদ ঘুচিয়ে বাংলাদেশ আজ নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে শামিল হয়েছে। মাথাপিছু আয় এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার আজ ঈর্ষণীয়।
খাদ্য ও কৃষি: জনসংখ্যা দ্বিগুণ হওয়ার পরও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির কল্যাণে বাংলাদেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ।
অবকাঠামোগত উন্নয়ন: নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, কর্ণফুলী টানেল, মেট্রোরেল এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দরের মতো মেগা প্রকল্পগুলো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার জানান দেয়।
সামাজিক সূচক: মানবউন্নয়ন সূচকে, বিশেষ করে গড় আয়ু বৃদ্ধি, শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার হ্রাস, নারী শিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। তৈরি পোশাক খাত এবং প্রবাসী শ্রমিকদের রেমিট্যান্স আমাদের অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছে।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাস্তবায়ন ও বর্তমান বাস্তবতা
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দৃশ্যমান উন্নয়ন হলেও মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা তথা সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার কতটুকু প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। অসাম্প্রদায়িকতার চেতনা আমাদের সংবিধানে অন্যতম মূল নীতি হিসেবে থাকলেও সমাজে পরমতসহিষ্ণুতা এবং ধর্মীয় সম্প্রীতির ওপর প্রায়শই আঘাত আসছে। রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনার বিচ্যুতি লক্ষ্য করা যায়, যা সামগ্রিক জাতীয় উন্নয়নকে টেকসই করার পথে বড় অন্তরায়।
আমাদের জাতীয় অপূর্ণ প্রত্যাশসমূহ
৫৫ বছরের স্বাধীন দেশে আমাদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে এখনও বড় ধরনের ব্যবধান রয়ে গেছে। প্রধান অপূর্ণতাগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
১. অর্থনৈতিক বৈষম্য ও ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান:
স্বাধীনতার অন্যতম মূল লক্ষ্য ছিল অর্থনৈতিক শোষণ থেকে মুক্তি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, দেশে ধনবৈষম্য চরম আকার ধারণ করেছে। একদিকে এক শ্রেণীর মানুষের হাতে বিপুল পরিমাণ সম্পদ পুঞ্জীভূত হচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাড়লেও তার সুফল সব স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। ‘সাম্য’ এর যে স্বপ্ন মুক্তিযোদ্ধারা দেখেছিলেন, তা অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে আজও অপূর্ণ রয়ে গেছে।
২. গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ও সুশাসন:
একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার। কিন্তু ৫৫ বছরেও আমরা একটি সুদৃঢ় ও সর্বজনগ্রাহ্য নির্বাচন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারিনি। প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রের দুর্বলতা, জবাবদিহিতার অভাব এবং পরমতসহিষ্ণুতার ঘাটতি আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে বারবার কলুষিত করেছে। সুশাসনের অভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিরপেক্ষতা ও কার্যকারিতা হারাচ্ছে।
৩. দুর্নীতি ও অর্থ পাচার:
বর্তমান বাংলাদেশের উন্নয়নের সবচেয়ে বড় বাধা হলো দুর্নীতি। রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি জেঁকে বসেছে। ব্যাংক খাতের কেলেঙ্কারি, ঋণখেলাপি সংস্কৃতি এবং দেশ থেকে কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার হওয়ার ঘটনা আমাদের অর্থনৈতিক ভিতকে দুর্বল করে দিচ্ছে। দুর্নীতিমুক্ত সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে না পারা স্বাধীনতার অন্যতম বড় ব্যর্থতা।
৪. বেকারত্ব ও মানসম্মত শিক্ষার অভাব:
আমাদের শিক্ষার হার বাড়লেও শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা যায়নি। কর্মমুখী শিক্ষার অভাবে দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। লক্ষ লক্ষ তরুণ যুবক আজ উপযুক্ত কর্মসংস্থানের অভাবে হতাশায় ভুগছে, যা জনমিতিক লভ্যাংশ বা ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ পাওয়ার সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করছে।
৫. বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও সামাজিক ন্যায়বিচার:
আইনের শাসন এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও আমাদের বড় অপূর্ণতা রয়েছে। দুর্বল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী প্রায়শই ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়। আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগের অভাব এবং বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা জনগণের মনে ক্ষোভের জন্ম দেয়।
উত্তরণের উপায় ও করণীয়
স্বাধীনতার ৫৫ বছরের অপূর্ণতাগুলোকে পেছনে ফেলে একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে হলে আমাদের দ্রুত কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে:
সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ: রাষ্ট্রীয় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দুর্নীতিবাজদের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিচয় বিবেচনা না করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা: অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থার মাধ্যমে জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে হবে এবং রাজনীতিতে পরমতসহিষ্ণুতা ও সহাবস্থানের সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে হবে।
বৈষম্য হ্রাস ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন: কর ব্যবস্থার সংস্কার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী জোরদার করার মাধ্যমে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান কমিয়ে আনতে হবে। উন্নয়ন হতে হবে সর্বজনীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক।
শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন: প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থাকে ভেঙে যুগোপযোগী, বিজ্ঞানমনস্ক ও প্রযুক্তি-নির্ভর কর্মমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যেন আমাদের তরুণ প্রজন্ম বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা: বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করে প্রতিটি নাগরিকের জন্য সমান আইনি অধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ জিয়ার ঐতিহাসিক ভুমিকা এবং সম্মুখসমরে সেকটর কমান্ডার হিসেবে সাহসিকতা এ দেশের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্র, উৎপাদনমুখী অর্থনীতির প্রবর্তন করেছিলেন, তা দেশকে একতাবদ্ধ করেছিল। আজকের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় তার সন্তান হিসেবে তারেক রহমানের রাজনৈতিক পথচলা এ দেশের মানুষের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে আমার প্রত্যাশা হলো একটি স্থায়ী রাজনৈতিক ও সামাজিক সম্প্রীতির পরিবেশ তৈরি করা। হিংসা, প্রতিশোধ এবং বিভাজনের রাজনীতি পরিহার করে সব মত ও পথের মানুষকে দেশের উন্নয়নে অংশীদার করার যে ‘রেইনবো নেশন’ বা রংধনু জাতির ধারণা, তা বাস্তবে রূপদান করা জরুরি। সব ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করাই হবে সম্প্রীতির প্রকৃত ভিত্তি।
মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রত্যেক নাগরিক যেন তার অধিকার ফিরে পায় এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে যেন একটি জবাবদিহিতামূলক বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গড়ে ওঠে—সেটিই আজ সময়ের দাবি।
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পূর্তির এই মাহেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আমাদের পেছনের সব ব্যর্থতাকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার শপথ নিতে হবে।
অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রতিহিংসা ভুলে যদি সাম্য, ন্যায়বিচার এবং সামাজিক সম্প্রীতির এক নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলা যায়, তবেই মুক্তিযুদ্ধের শহীদের আত্মা শান্তি পাবে এবং দেশের স্বাধীনতা পূর্ণতা লাভ করবে।
স্বাধীনতার ৫৫ বছর আমাদের গৌরব এবং আত্মোপলব্ধির এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ। বিপুল আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এই দেশ আজ বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে, যা আমাদের অহংকার। তবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি যদি আমরা সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে না পারি, তবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অধরাই থেকে যাবে। দল-মত নির্বিশেষে দেশের সকল নাগরিক, তরুণ প্রজন্ম এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। অতীতের ভুল ও অপূর্ণতা থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি শোষণমুক্ত, গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন ‘সোনার বাংলা’ গড়ে তোলাই হোক আমাদের ৫৫ বছরের অঙ্গীকার।
লেখক- রাষ্ট্র-সমাজ চিন্তক, গবেষক ও সভাপতি, বাংলাদেশ পিপলস পাওয়ার পার্টি. বিপিপিপি।