মুহাম্মদ আতা উল্লাহ খান
বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ট্রাফিক পুলিশ সচরাচর সাধারণ মানুষের ক্ষোভ এবং ট্রোলের শিকার হয়। কিন্তু যখন কোনো ট্রাফিক পুলিশ সদস্য ভিআইপি সংস্কৃতির ব্যারিকেড ভেঙে একজন সরকারের প্রভাবশালী বিমান ও পর্যটন মন্ত্রীর গাড়িকে মন্ত্রীর উপস্থিতিতে আইন ভঙ্গের দায়ে দু-দুটি মামলা ঠুকে দেন, তখন তা কেবল একটি সাধারণ জরিমানা থাকে না; তা হয়ে ওঠে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এই সাহসী পদক্ষেপকে আমরা জানাই আন্তরিক “সাব্বাস”। এটি প্রমাণ করে যে, সদিচ্ছা ও পেশাদারিত্ব থাকলে রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে আইনের সমানভাবে প্রয়োগ সম্ভব।
আমাদের সমাজে দীর্ঘদিন ধরে একটি অলিখিত নিয়ম চলে আসছে—আইন কেবল সাধারণ জনগণের পকেট কাটার জন্য, আর ক্ষমতাশালীদের জন্য রয়েছে দায়মুক্তির বিশেষ লাইসেন্স। রাস্তায় সাইরেন বাজিয়ে, ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করে মন্ত্রীদের গাড়ি চলে যাওয়াটাই যেখানে স্বাভাবিক চিত্র, সেখানে একজন মন্ত্রীর গাড়িকে থামিয়ে আইনের মুখোমুখি দাঁড় করানো নিঃসন্দেহে এক বৈপ্লবিক ঘটনা। এই ঘটনাটি ট্রাফিক পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষের হারিয়ে যাওয়া আস্থা ফিরিয়ে আনতে দারুণভাবে সাহায্য করবে। এটি বার্তা দেয় যে, ক্ষমতার চেয়ে আইনের অবস্থান অনেক উর্ধ্বে।
পুলিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রায়শই মেরুদণ্ডহীনতা এবং রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তির অভিযোগ ওঠে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বা রাজনৈতিক নেতাদের অন্যায্য চাপের মুখে অনেক সময়ই সৎ পুলিশ অফিসাররা কাজ করতে পারেন না। কিন্তু এই মামলার ঘটনাটি বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার এক নতুন প্রেরণা জোগায়। আমরা চাই পুলিশের এই সোজা হওয়া মেরুদণ্ড যেন আর কখনোই কোনো রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক চাপে নুয়ে না পড়ে। বদলি বা শাস্তির ভয়কে জয় করে যখন একজন পুলিশ সদস্য তার দায়িত্ব পালন করেন, তখনই একটি সমাজ সত্যিকারের গণতান্ত্রিক হয়ে ওঠে।
তবে এই প্রশংসা তখনই টেকসই হবে, যখন এই ব্যবস্থাটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা না হয়ে একটি স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মে পরিণত হবে। আজ যিনি সাহসিকতা দেখালেন, তাকে যেন পরবর্তীতে কোনো অদৃশ্য ইশারায় শাস্তিমূলক বদলি বা হয়রানির শিকার হতে না হয়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের উচ্চপর্যায়ের। স্বয়ং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী যদি এই মামলাকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে নিজের ভুল স্বীকার করেন, তবে তা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্যও এক দারুণ ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হবে।
আইনের শাসন কেবল বইয়ের পাতায় বা বক্তৃতার মঞ্চে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না, তার প্রতিফলন দেখতে হবে রাজপথে। ট্রাফিক পুলিশের এই মেরুদণ্ড সোজা রাখার লড়াইয়ে দেশের সাধারণ জনগণ সবসময় পাশে থাকবে। পুলিশ বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। এই একটি ঘটনাই যেন দেশের পুরো পুলিশ বাহিনীর জন্য একটি টার্নিং পয়েন্ট হয়। প্রতিটি ট্রাফিক সিগন্যালে, প্রতিটি মোড়ে পুলিশ যেন ক্ষমতার দাপট ভুলে কেবল আইনের চোখ দিয়ে অপরাধীকে বিচার করতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, এই মামলা কেবল একটি গাড়ির বিরুদ্ধে নয়, এটি মূলত ভাঙা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ প্রতিবাদ। ট্রাফিক পুলিশের এই সোজা হওয়া মেরুদণ্ড যেন গোটা পুলিশ বাহিনীর প্রতীক হয়ে ওঠে। সাব্বাস ট্রাফিক পুলিশ! আপনাদের এই সততা এবং সাহসিকতা অক্ষুণ্ন থাকুক।
লেখক- নজরুল গবেষক, রাষ্ট্রচিন্তক ও যুগ্ম সম্পাদক দৈনিক নিরপেক্ষ।