• সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০২ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]
Headline
কবিতাঃ পথ শিশুর জীবন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ডোমকলে প্রকাশিত হলো মাসিক সাহিত্য পত্রিকা ‘অন্যমুখ’ পাটগ্রাম ও হাতিবান্ধা সীমান্তে ৬১ বিজিবির অভিযানে ২ জন আটক, ভারতীয় মাদক ও মোটরসাইকেল জব্দ কলমাকান্দায় গারো যুব সমাবেশ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও কুইজ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত আবরার ফাহাদ এর মৃত্যু: একটি আয়না এবং ছাত্ররাজনীতির ভবিষ্যৎ কবিতাঃ মা এসেছেন ময়মনসিংহে প্রথম কমিউনিটি পুলিশ কাবাডি চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল অনুষ্ঠিত, নারী বিভাগে কোতোয়ালি, পুরুষ বিভাগে ফুলপুর থানা দল চ্যাম্পিয়ন ময়মনসিংহে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, পূর্ণাঙ্গ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ও শিশু পার্ক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হবে- বিমানমন্ত্রী পাঁচবিবিতে পূজার নারিকেল-গুড় কেনার ধুম থানচিতে ৩১ পিস ইয়াবাসহ যুবক আটক

আবরার ফাহাদ এর মৃত্যু: একটি আয়না এবং ছাত্ররাজনীতির ভবিষ্যৎ

Reporter Name / ২৬ Time View
Update : সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬

আজাদুল হক আজাদ, কবি ও গল্পকার:

কিছু মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের বুক খালি করে না—কিছু মৃত্যু একটি জাতির বিবেককে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। আবরার ফাহাদের মৃত্যু তেমনই একটি মৃত্যু। বুয়েটের মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে শেরেবাংলা হলের একটি কক্ষে নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রাণ হারান। তাঁর মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতি, ছাত্ররাজনীতি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নকে একসঙ্গে সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।

আবরার শুধু একজন মেধাবী শিক্ষার্থী ছিলেন না; তিনি নিজের দেশের স্বার্থ নিয়ে প্রশ্ন তোলার সাহস দেখিয়েছিলেন। তাঁর শেষ দিকের ফেসবুক লেখাগুলোতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয়, বিশেষ করে ফেনী নদীর পানি প্রত্যাহার, বন্দর ব্যবহার ও জ্বালানি-সম্পদ সংক্রান্ত সমঝোতা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন। ২০১৯ সালের ৫ অক্টোবরের পোস্টে তিনি ভারতের সঙ্গে ফেনী নদীর পানি প্রত্যাহারের বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা করেন। ওই পোস্টে তিনি বাংলাদেশের স্বার্থ ও প্রাপ্তির হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। পরদিনই হয় তাঁর জীবনের শেষ রাত।

এই ঘটনাপ্রবাহের কারণেই বহু মানুষের কাছে আবরার আজ কেবল একজন নিহত বুয়েট শিক্ষার্থী নন; তিনি হয়ে উঠেছেন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, জাতীয় স্বার্থ এবং আধিপত্যবিরোধী প্রতিবাদের প্রতীক।

লেখকের দৃষ্টিতে, এই অর্থে আবরার ফাহাদকে বাংলাদেশের ভারতীয় আধিপত্যবিরোধী প্রতিবাদের একজন প্রথম সারির শহীদ হিসেবে স্মরণ করা যায়। তবে তাঁর হত্যার বিচারিক নথি ও আদালতের রায়কে কেন্দ্র করে যে বিষয়টি নিশ্চিতভাবে বলা যায়, তা হলো—তাঁকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছিল এবং এই হত্যাকাণ্ডে তৎকালীন আওয়ামী সরকারের রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনের সদস্যদের সংশ্লিষ্টতা মামলার বিচারে প্রমাণিত হয়েছে।

আবরারের শেষ ফেসবুক পোস্টে কোনো অস্ত্রের ভাষা ছিল না, কোনো সহিংসতার আহ্বানও নয়। তা ছিল সহজসরল অথচ ক্ষুরধার প্রশ্নের ভাষায়।

বাংলাদেশের সম্পদ, পানি, বন্দর ও জ্বালানি নিয়ে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে দেশের স্বার্থ কতটা রক্ষা হচ্ছে—তিনি সেই প্রশ্নই তুলেছিলেন।

ফেনী নদী থেকে ভারতের সাবরুম শহরের পানীয়-জলের জন্য ১.৮২ কিউসেক পানি প্রত্যাহারের বিষয়ে ২০১৯ সালে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা হয়েছিল। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের প্রকাশিত নথিতেও ১.৮২ কিউসেক পানি প্রত্যাহারের বিষয়টি উল্লেখ আছে।

একজন নাগরিক এই চুক্তির পক্ষে প্রশ্ন তুলতে পারেন, বিপক্ষেও প্রশ্ন তুলতে পারেন। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেই—রাষ্ট্রীয় নীতির সমালোচনা করার অধিকার নাগরিকের আছে।

কিন্তু আবরারের ক্ষেত্রে সেই প্রশ্নই যেন তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগে পরিণত হয়েছিল। তিনি কেন ভারতের সমালোচনা করছেন? তিনি কেন রাষ্ট্রীয় চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন? তিনি কি কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত?

এই ধরনের প্রশ্নের মধ্য দিয়ে একজন শিক্ষার্থীর ওপর যে ক্ষমতার প্রয়োগ ঘটেছিল, সেটিই শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির ভয়াবহ সংকটকে সামনে নিয়ে আসে।

 

দেশপ্রেমের অর্থ অন্য দেশের মানুষকে ঘৃণা করা নয়। দেশপ্রেমের অর্থ নিজের দেশের স্বার্থ, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও মানুষের অধিকার নিয়ে সচেতন থাকা।

আবরারের লেখায় ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বিভিন্ন অসমতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। তিনি ফেনীর পানি নিয়ে প্রশ্ন করেছেন, বন্দর ব্যবহারের বিষয় তুলেছেন, জ্বালানি সম্পদ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এর সঙ্গে একমত হওয়া বা না হওয়া—দুটিই নাগরিক স্বাধীনতার অংশ।

কিন্তু কোনো নাগরিকের বক্তব্যের জবাব হওয়া উচিত যুক্তি; নির্যাতন নয়। রাষ্ট্রীয় নীতির সমালোচনার জবাব হওয়া উচিত তথ্য; লাঠি নয়। ভিন্নমতের জবাব হওয়া উচিত আরেকটি ভিন্নমত; নিপীড়ন নয়। এখানেই আবরারের মৃত্যু আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষা দেয়।

বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির ইতিহাস গৌরবের। ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন—দেশের গণতান্ত্রিক ও জাতীয় সংগ্রামে ছাত্রসমাজের অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু ইতিহাসের গৌরব দিয়ে বর্তমানের সবকিছু বৈধতা দেওয়া যায় না।

যখন ছাত্ররাজনীতি বড় রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তিতে পরিণত হয়, তখন শিক্ষার্থীর স্বার্থ পেছনে পড়ে যায়। সংগঠনের আদর্শের জায়গায় আসে ব্যক্তিপূজা, নেতৃত্বের জায়গায় আসে ক্ষমতার প্রদর্শন, আর রাজনৈতিক মতের জায়গায় আসে আনুগত্যের পরীক্ষা।

তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণ বা হলগুলো হয়ে উঠে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্র।

তখন, সেখানে কে কোন মতের? কে কার সঙ্গে কথা বলে? কে কী লিখেছে? কে সরকারের সমালোচনা করেছে? কে অন্য রাজনৈতিক মতের প্রতি সহানুভূতিশীল?

এসব প্রশ্ন যদি একজন শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা নির্ধারণ করতে শুরু করে, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় আর জ্ঞানচর্চার মুক্তাঙ্গন থাকে না।

আবরারের ঘটনা আমাদের সেই অন্ধকারটাই দেখিয়েছে।

যদিও আবরার জানতেন না তাঁর লেখা কোথায় গিয়ে পৌঁছাবে। তিনি হয়তো ভাবেনওনি, একটি ফেসবুক পোস্ট তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়ের সূচনা করবে।

তবে একটু জানতেন যে, তৎকালীন রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় আঙ্গুল তোলা বা ভারতীয় সার্থের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া বিপদজনক হতে পারে। তবু তিনি লিখেছিলেন। প্রশ্ন করেছিলেন। রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজের মত প্রকাশ করেছিলেন। এই জায়গাতেই আবরারের সাহস বীরতুল্য।

তাঁর সব রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সঠিক ছিল কি না, তাঁর প্রতিটি বক্তব্যের সঙ্গে সবাই একমত কি না—সেটি ইতিহাসের আলোচনার বিষয় হতে পারে। কিন্তু নিজের দেশের স্বার্থ নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার তাঁর ছিল। সেই অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না।

তাই আবরারকে স্মরণ করার অর্থ শুধু তাঁর হত্যার বিচার দাবি করা নয়; তাঁর মতো করে প্রশ্ন করার সাহসটিকেও বাঁচিয়ে রাখা।

ক্ষমতা অনেক সময় মানুষকে ভুল বার্তা দেয়—ক্ষমতা যেন চিরস্থায়ী, রাজনৈতিক পরিচয় যেন ঢাল, সংগঠনের পদ যেন আইনের ঊর্ধ্বে থাকার চাবিকাঠি।

সমগ্র দেশবাসীর ক্ষোভ ও ন্যায় বিচারের প্রত্যাশা — আবরার হত্যাকাণ্ড সেই ধারণার নির্মম পরিণতি দেখিয়েছে। বিচারিক আদালত ২০২১ সালে ২০ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। ২০২৫ সালের মার্চে হাইকোর্ট সেই সাজা বহাল রাখে। তবে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত মামলাটির চূড়ান্ত বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হয়নি; আপিল বিভাগের সিদ্ধান্ত এখনো বাকি।

একসময় যারা ক্যাম্পাসে ক্ষমতার পরিচয়ে পরিচিত ছিল, তাদের অনেকের পরিচয় আজ হত্যামামলার দণ্ডিত আসামি হিসেবে লেখা হয়েছে।

এটাই ক্ষমতার সবচেয়ে বড় শিক্ষা— ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু অপরাধের দায় দীর্ঘস্থায়ী। রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া মানুষকে কিছু সময়ের জন্য ভয় দেখাতে পারে; কিন্তু ইতিহাসের আদালত থেকে পালানোর পথ খুব সংকীর্ণ।

বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতি একসময় ছিল স্বপ্ন দেখার রাজনীতি। ভাষার জন্য লড়াই ছিল। স্বাধিকারের জন্য লড়াই ছিল। স্বাধীনতার জন্য লড়াই ছিল। গণতন্ত্রের জন্য লড়াই ছিল। সেই ছাত্ররাজনীতি মানুষকে নেতৃত্ব দিতে শিখিয়েছে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শিখিয়েছে। রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করতে শিখিয়েছে।

কিন্তু পরবর্তী সময়ে ছাত্ররাজনীতির একটি অংশ লোভ এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক সংস্কৃতির সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত হয়েছে যে, অনেক ক্ষেত্রে ছাত্রত্বের চেয়ে দল বড় হয়েছে, শিক্ষার চেয়ে পদ বড় হয়েছে, আদর্শের চেয়ে আনুগত্য বড় হয়েছে।

এখানেই ঐতিহাসিক ছাত্ররাজনীতি আর লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য।

আবরারের মৃত্যুর পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল—দেশের স্বনামপ্রসিদ্ধ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষার্থী কীভাবে এতটা অসহায় হয়ে পড়লেন? কীভাবে একটি আলাদা কক্ষে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হলো? কীভাবে সেখানে এতক্ষণ ধরে নির্যাতনের ঘটনা ঘটল? কেন অন্যরা সময়মতো তাঁকে রক্ষা করতে পারল না?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর শুধু একটি হত্যামামলার সাক্ষ্য-প্রমাণে সীমাবদ্ধ নয়। এগুলো আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিকেই প্রশ্ন করে।

বিশ্ববিদ্যালয় কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যালয় নয়। হল কোনো রাজনৈতিক নেতার ব্যক্তিগত রাজ্য নয়। আর একজন শিক্ষার্থী কোনো সংগঠনের কর্মী না হলে তার নিরাপত্তা কমে যাবে—এমন রাষ্ট্র আমরা চাই না।

ছাত্ররাজনীতি থাকবে কি থাকবে না—এই বিতর্কের চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, কী ধরনের ছাত্ররাজনীতি থাকবে?

ভবিষ্যতের ছাত্ররাজনীতিকে হতে হবে শিক্ষার্থী ও দেশের স্বার্থকেন্দ্রিক। সেখানে নেতৃত্ব মানে হবে সততা, স্বচ্ছতা ও সেবা। রাজনীতি মানে হবে বিতর্ক। সংগঠন মানে হবে মতের বহুত্ব। দেশপ্রেম মানে হবে দেশের স্বার্থ নিয়ে প্রশ্ন করার সাহস।

আর প্রতিপক্ষ মানে হবে এমন একজন মানুষ, যার সঙ্গে যুক্তিতে লড়াই করা যায়—নির্যাতন করা যায় না।

বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো শিক্ষার্থী কী লিখবে, কী ভাববে, কোন রাজনৈতিক মত পোষণ করবে—সেটি তার নাগরিক স্বাধীনতার অংশ।

কেউ ভারত বা বিদেশনীতির পক্ষে বা বিপক্ষে কথা বলবেন, কেউ সমালোচনা করবেন; কেউ সরকারের নীতির প্রশংসা করবেন, কেউ কঠোর সমালোচনা করবেন। গণতন্ত্র এসব মতের সহাবস্থানেই বেঁচে থাকে।

আমার কাছে আবরার ফাহাদ শুধু একজন নিহত শিক্ষার্থী নন। তিনি এমন এক প্রজন্মের প্রতীক, যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের মত প্রকাশ করতে শিখেছিল, রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন করতে শিখেছিল এবং জাতীয় স্বার্থ নিয়ে ভাবতে শিখেছিল।

তাঁর ফেনী নদী নিয়ে প্রশ্ন ছিল। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন ছিল। বাংলাদেশের সম্পদ ও সার্বভৌম স্বার্থ নিয়ে প্রশ্ন ছিল।

আর সেই প্রশ্নের পরিণতিই তাঁকে ইতিহাসের এক নির্মম অধ্যায়ে নিয়ে যায়। এই অর্থে আবরারকে দেশপ্রেমিক ও ভারতীয় আধিপত্যবিরোধী চেতনার প্রতীক হিসেবে স্মরণ করা অনেকের কাছেই স্বাভাবিক। আর লেখকের মূল্যায়নে তাঁকে সেই ধারার একজন প্রথম সারির শহীদ বলা যেতে পারে।

তবে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়তো আরও সরল—তিনি প্রশ্ন করার অপরাধে জীবন হারানো প্রথম মেধাবী বাংলাদেশি তরুণ।

আবরারের মৃত্যু আমাদের সামনে দুটি বাংলাদেশকে দাঁড় করিয়ে দেয়।

একটি বাংলাদেশ—যেখানে ক্ষমতার ছায়ায় ভিন্নমতকে ভয় দেখানো হয়। আরেকটি বাংলাদেশ—যেখানে একজন তরুণ ফেনী নদীর পানি নিয়ে প্রশ্ন করতে পারে, দেশের সম্পদ নিয়ে প্রশ্ন করতে পারে, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন করতে পারে এবং সেই প্রশ্নের জবাব পেতে পারে যুক্তিতে।

আমরা কোন বাংলাদেশ চাই? আবরারের রক্তের সবচেয়ে বড় শিক্ষা এখানেই। শুধু কয়েকজন খুনির শাস্তি হলেই আবরারের প্রতি আমাদের দায়িত্ব শেষ হবে না। এমন রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে, যেখানে কোনো ছাত্র সংগঠনের পরিচয় কাউকে অন্যের ওপর ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকার দেবে না।

যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল হবে নিরাপদ। যেখানে রাজনীতি হবে সু-মতের, উর্বর মস্তিষ্কের ও আদর্শের।

যেখানে দেশপ্রেমের অর্থ হবে দেশের স্বার্থে প্রশ্ন করা। যেখানে রাষ্ট্রনীতির বা বিদেশনীতির নানাবিধ সম্পর্ক নিয়ে সমালোচনা করা যাবে, আবার সম্পর্কের পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তিও দেওয়া যাবে। যেখানে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তকে প্রশ্ন করা হবে নাগরিক অধিকার হিসেবে—অপরাধ হিসেবে নয়।

আবরার ফাহাদ আজ নেই। তাঁর পরিবার এখনো চূড়ান্ত বিচারিক নিষ্পত্তির অপেক্ষায়। কিন্তু তাঁর শেষ প্রশ্নগুলো এখনো আমাদের সামনে।

ফেনী নদীর পানি কার? দেশের সম্পদের হিসাব কোথায়? রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে জনগণের স্বার্থ কতটা রক্ষা হচ্ছে? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—একজন ছাত্র নিজের দেশের স্বার্থ নিয়ে প্রশ্ন করার অধিকার হারাবে কেন?

আবরারের হত্যার বিচার একদিন আইনের শেষ ধাপে পৌঁছাবে। কিন্তু প্রকৃত বিচার তখনই সম্পূর্ণ হবে, যখন বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থীকে আর তার মতের জন্য ভয় পেতে হবে না।

আবরারকে শুধু স্মরণ নয়—আবরারের প্রশ্নগুলোকে বাঁচিয়ে রাখাই হোক আমাদের অঙ্গীকার। কারণ একটি জাতির ভবিষ্যৎ তার বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালের ভেতরেই তৈরি হয়। আর সেই ভবিষ্যৎ যদি ভয়ের ওপর দাঁড়ায়, তাহলে রাষ্ট্র শক্তিশালী হয় না—ভেতর থেকে দুর্বল হয়ে যায়।

আবরার ফাহাদ তাই শুধু একটি নাম নয়; তিনি প্রশ্ন করার ক্ষমতা, সাহস। তিনি প্রতিবাদ। তিনি অসমাপ্ত স্বপ্ন, একটি প্রজন্মের বিবেক।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
bdit.com.bd