• শুক্রবার, ০৭ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:৩৫ পূর্বাহ্ন
  • [gtranslate]
Headline
বন্যার্তদের পাশে ‘লোহাগাড়া সোশ্যাল সোসাইটি’ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার পেল ঢেউটিন লোহাগাড়ায় বিদ্যুৎস্পৃষ্টে দুই শ্রমিক সংকটাপন্ন জগন্নাথপুরে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস পালন কটিয়াদীতে তিতাস গ্যাসের চোরাই লিকেজ পাইপ, সফল ভাবে মেরামত এবং অবৈধ চুনের কারখানার জমিদাতা দুইজন গ্রেফতার “পাচায় ঘা মাথায় মলম” প্রেক্ষিত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নেত্রকোণায় ২০ আগস্ট শুরু হচ্ছে সপ্তাহব্যাপী বৃক্ষমেলা, প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত সিলেটের বিশ্বনাথে ফেইক ফেসবুক একাউন্টে কুৎসা রটনার অভিযোগে থানায় জিডি বিশ্বনাথে‘১১ দলীয় ঐক্য উপজেলা ও পৌরসভা’র উদ্যোগে আয়োজিত গণমিছিল গাজীপুরে অপরাধ দমনে কঠোর জিএমপি: অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার বেলায়েত হোসেনের দক্ষ নেতৃত্বে দৃশ্যমান অগ্রগতি রংপুরে চলন্ত ট্রেনে উঠতে গিয়ে ওয়েম্যানের মৃত্যু

“পাচায় ঘা মাথায় মলম” প্রেক্ষিত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন

Reporter Name / ৫৬ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট, ২০২৬

এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী

একটি সংকটের প্রকৃত সমাধান যেখানে নিহিত, সেখানে আঘাত না করে অন্য কোথাও বাহ্যিক প্রলেপ দেওয়ার নীতিকে বাংলায় রূপক অর্থে বলা হয় ”পাচায় ঘা মাথায় মলম”। বর্তমান বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এবং দীর্ঘস্থায়ী মানবিক ও ভূরাজনৈতিক সংকট হলো রোহিঙ্গা সমস্যা। ২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্মম নির্যাতনের মুখে জীবন বাঁচাতে প্রায় ১৪ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। দীর্ঘ প্রায় এক দশক হতে চললেও এই বিশাল জনগোষ্ঠীর সম্মানজনক, নিরাপদ এবং স্থায়ী প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে আছে। এই সংকটের মূল ক্ষত বা ‘ঘা’ লুকিয়ে আছে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, নাগরিকত্ব আইন এবং দেশটির সরকারের অনীহার মধ্যে। এর প্রকৃত সমাধান কেবল মিয়ানমার সরকারের সাথে জোরালো ও কার্যকর দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমেই সম্ভব। অথচ, বাস্তব চিত্র ভিন্ন। বছরের পর বছর ধরে আমরা দেখছি জাতিসংঘ মহাসচিব থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশি-বিদেশি প্রতিনিধি দল, ভিআইপি এবং এনজিও কর্মকর্তারা নিয়মতান্ত্রিকভাবে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করছেন। এই পরিদর্শন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কান্নাকাটির যে বার্ষিক উৎসব চলছে, তা আদতে সংকটের মূল জায়গায় কোনো স্পর্শই করছে না। এটি যেন সেই মাথায় মলম লাগানোর মতোই এক অর্থহীন সান্ত্বনা। এই প্রক্রিয়ায় দিনশেষে লাভবান হচ্ছে কেবল বিদেশি তহবিলপুষ্ট এনজিওগুলো, আর দীর্ঘমেয়াদি চরম ক্ষতির মুখে পড়ছে বাংলাদেশের অর্থনীতি, নিরাপত্তা, পরিবেশ এবং সার্বভৌমত্ব।
যেকোনো রোগের চিকিৎসার প্রথম শর্ত হলো সঠিক রোগ নির্ণয় এবং ক্ষতের স্থানে সরাসরি ওষুধ প্রয়োগ। বর্তমান রোহিঙ্গা সংকটের ক্ষেত্রে ‘ক্ষত’ বা ঘা হলো মিয়ানমার। কারণ, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক এবং তাদের জোরপূর্বক বিতাড়ন করেছে সে দেশের জান্তা সরকার ও মগ সেনারা। অতএব, এই সমস্যার সমাধানও করতে হবে মিয়ানমারকে সাথে নিয়ে, দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে।
কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের একটি বড় অংশের ভূমিকা দেখলে মনে হয়, সমস্যাটি যেন বাংলাদেশের তৈরি। জাতিসংঘের মহাসচিব, বড় বড় দেশের রাষ্ট্রদূত কিংবা মানবাধিকার সংস্থার কর্তাব্যক্তিরা প্রতি বছর সাজগোজ করে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আসেন। তারা রোহিঙ্গাদের দুঃখ-দুর্দশার গল্প শোনেন, ছবি তোলেন, গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং কিছু আর্থিক সহায়তার আশ্বাস দিয়ে চলে যান। এই যে কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোকে কেন্দ্র করে বিশ্ব রাজনীতির এবং দাতব্য সংস্থার একটি বড় কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে, এটিই হলো “মাথায় মলম” দেওয়ার শামিল। মাথায় মলম দিলে যেমন মলদ্বারের ঘা শুকায় না, ঠিক তেমনি আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের এই পর্যটনধর্মী ক্যাম্প পরিদর্শনে মিয়ানমার সরকারের ওপর বিন্দুমাত্র চাপ সৃষ্টি হয় না। মূল ক্ষত বা মিয়ানমারের অনীহাকে পাশ কাটিয়ে কেবল বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো বা ক্যাম্প পরিদর্শনের এই নীতি বর্তমান সংকটকে আরও দীর্ঘায়িত করছে।
দ্বিপাক্ষিক আলোচনার অনুপস্থিতি ও স্থবিরতা
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার একমাত্র কার্যকর পথ হলো বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে অত্যন্ত কঠোর এবং সুনির্দিষ্ট দ্বিপাক্ষিক আলোচনা। এর সাথে চীন, ভারত বা আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে রাখা যেতে পারে। কিন্তু বিগত বছরগুলোতে দেখা গেছে, মিয়ানমার সরকারের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার টেবিল প্রায় পুরোপুরি অচল। মিয়ানমার সরকার বিভিন্ন সময় আন্তর্জাতিক চাপের মুখে কাগজে-কলমে প্রত্যাবাসন চুক্তিতে সই করলেও, বাস্তবে একজন রোহিঙ্গাকেও ফেরত নেয়নি।
বাংলাদেশ সরকার যখনই আন্তর্জাতিক মহলের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, তখনই দ্বিপাক্ষিক কূটনীতি দুর্বল হয়েছে। আন্তর্জাতিক ফোরামে বড় বড় ভাষণ আর নিন্দা প্রস্তাব পাস করা সহজ, কিন্তু মিয়ানমারের জান্তা সরকারকে আলোচনার টেবিলে বসিয়ে বাধ্য করা অত্যন্ত কঠিন। বাংলাদেশ যদি আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের পেছনে শক্তি ও সময় ব্যয় না করে সরাসরি মিয়ানমার এবং তাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক দেশগুলোর (যেমন চীন ও রাশিয়া) সাথে সুনির্দিষ্ট ও শর্তহীন দ্বিপাক্ষিক দরকষাকষি না বাড়ায়, তবে এই সংকটের কোনো রাজনৈতিক সমাধান আসবে না। দ্বিপাক্ষিক আলোচনার এই অনুপস্থিতিই প্রমাণ করে যে, আমরা সমস্যার মূলে না গিয়ে কেবল চারপাশের ডালপালা নিয়ে ব্যস্ত আছি।
ক্যাম্প পরিদর্শনের অসারতা এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি
জাতিসংঘের মহাসচিব থেকে শুরু করে বিভিন্ন পশ্চিমা দেশের মন্ত্রী-আমলারা যখন রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন, তখন গণমাধ্যমে বড় বড় হেডলাইন হয়। কিন্তু বাস্তবিকভাবে এই পরিদর্শনের আউটপুট বা ফলাফল কী? ফলাফল শূন্য।
এই পরিদর্শনগুলোর পেছনে একটি ভূরাজনৈতিক সমীকরণ থাকে। পশ্চিমা দেশগুলো মিয়ানমার বা চীনের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য রোহিঙ্গা ইস্যুটিকে একটি রাজনৈতিক কার্ড বা ‘লিভারেজ’ হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। তারা ক্যাম্পে এসে মানবাধিকারের কথা বলে, কিন্তু মিয়ানমারের সাথে তাদের নিজস্ব বাণিজ্য বা কৌশলগত সম্পর্ক ছিন্ন করে না। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কোনো কঠোর নিষেধাজ্ঞা বা সামরিক পদক্ষেপের প্রস্তাব উঠলে তা ভেটো শক্তির কারণে বাতিল হয়ে যায়। ফলে, জাতিসংঘের মহাসচিবের ক্যাম্প পরিদর্শন কেবলই একটি আনুষ্ঠানিকতা এবং বিশ্ববাসীর সামনে নিজেদের ‘মানবিক’ মুখচ্ছবি তুলে ধরার প্রয়াস মাত্র। এই পরিদর্শনগুলো মিয়ানমারের জান্তা সরকারকে এই বার্তাই দেয় যে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কেবল বাংলাদেশেই ব্যস্ত থাকবে, তাদের সীমানার ভেতরে ঢুকে কেউ রোহিঙ্গাদের অধিকার ফিরিয়ে দেবে না।
এনজিওদের রমরমা ব্যবসা ও লাভ
রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ার পেছনে অন্যতম বড় সুবিধাভোগী গোষ্ঠী হলো দেশি ও আন্তর্জাতিক এনজিও । বর্তমান বিশ্বে মানবিক সংকটগুলো এনজিওদের জন্য এক বিশাল ‘শিল্প’ বা ব্যবসায় পরিণত হয়েছে, যাকে সমাজবিজ্ঞানীরা বলে আখ্যায়িত করেন।
তহবিলের অপচয়: আন্তর্জাতিক দাতাদের কাছ থেকে রোহিঙ্গাদের জন্য প্রতি বছর যে কোটি কোটি ডলার তহবিল আসে, তার একটি বিশাল অংশ খরচ হয় এনজিওগুলোর প্রশাসনিক কাজে। বিদেশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চড়া বেতন, ফাইভ-স্টার হোটেলে আবাসন, বিলাসবহুল পাজেরো গাড়ির ভাড়া এবং লজিস্টিক সাপোর্টেই তহবিলের প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ শেষ হয়ে যায়।
স্বার্থের দ্বন্দ্ব: এনজিওদের অস্তিত্ব টিকে থাকে সংকটের অস্তিত্বের ওপর। রোহিঙ্গা যদি নিজ দেশে ফিরে যায়, তবে কক্সবাজারে এনজিওদের এই বিশাল সাম্রাজ্য, কোটি কোটি ডলারের ফান্ডিং এবং হাজার হাজার কর্মসংস্থান বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে, অনেক এনজিওর ভেতরেই এক ধরনের প্রচ্ছন্ন অনিহা কাজ করে যাতে রোহিঙ্গারা এখনই ফিরে না যায়।
বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি
শুধু আন্তর্জাতিক পরিদর্শন আর এনজিওদের কার্যক্রমের ওপর ভরসা করে হাত গুটিয়ে বসে থাকার খেসারত দিতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। এই সংকটের কারণে দেশের যে বহুমুখী ক্ষতি হচ্ছে, তা অপূরণীয়:
অর্থনৈতিক ক্ষতি ও বাজেটের ওপর চাপ
যদিও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল থেকে কিছু সাহায্য আসে, তা মোট খরচের তুলনায় অত্যন্ত সামান্য। প্রতি বছর রোহিঙ্গাদের খাদ্য, চিকিৎসা, স্যানিটেশন, এবং সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার জন্য বাংলাদেশ সরকারকে নিজস্ব তহবিল থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরের জন্য বাংলাদেশ সরকার হাজার কোটি টাকা খরচ করে আবাসন তৈরি করেছে। এই অর্থ দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যবহার করা যেত।
জাতীয় নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি
কক্সবাজার ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো এখন অপরাধের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। সেখানে আরসা (অজঝঅ) বা আরএসও (জঝঙ)-এর মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর আধিপত্য তৈরি হয়েছে। প্রতিনিয়ত ক্যাম্পে খুন, অপহরণ, এবং চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটছে। সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ হলো, এই ক্যাম্পগুলো মাদক চোরাচালান (বিশেষ করে ইয়াবা ও আইস) এবং মানব পাচারের প্রধান রুটে পরিণত হয়েছে। রোহিঙ্গাদের এই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক বিরাট হুমকি।
জনসংখ্যাতাত্ত্বিক ভারসাম্য ও স্থানীয় জনগণের দুর্ভোগ
কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের স্থানীয় অধিবাসীরা এখন নিজেদের ভূমিতেই সংখ্যালঘু হয়ে পড়েছে। রোহিঙ্গাদের বিপুল জনসংখ্যার চাপে স্থানীয় বাংলাদেশি যুবকদের কর্মসংস্থান হারিয়ে গেছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে এবং যাতায়াত ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এই জনসংখ্যাতাত্ত্বিক পরিবর্তন বাংলাদেশের ওই অঞ্চলের রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে পারে।
বনাঞ্চল ও পরিবেশের ভয়াবহ বিপর্যয়
উখিয়া ও টেকনাফের হাজার হাজার একর সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও পাহাড় কেটে রোহিঙ্গা ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে ওই অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। হাতির চলাচলের পথ বন্ধ হয়েছে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে গেছে এবং মাটি আলগা হয়ে পাহাড় ধসের ঝুঁকি চরম আকার ধারণ করেছে। পরিবেশের এই ক্ষতি আগামী এক শতাব্দীতেও পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।
সংকট সমাধানের প্রকৃত পথ: কী করণীয়?
“পাচায় ঘা মাথায় মলম” দেওয়ার এই আত্মঘাতী নীতি থেকে বাংলাদেশকে দ্রুত বের হয়ে আসতে হবে। রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনের আন্তর্জাতিক তামাশা বন্ধ করে এবং এনজিওদের এজেন্ডার বাইরে গিয়ে শক্ত অবস্থানে যেতে হবে:
আগ্রাসী দ্বিপাক্ষিক কূটনীতি: মিয়ানমারের বর্তমান জান্তা সরকার এবং বিরোধী গোষ্ঠী (ঘধঃরড়হধষ টহরঃু এড়াবৎহসবহঃ – ঘটএ) উভয়ের সাথেই সমান্তরালভাবে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা শুরু করতে হবে। মিয়ানমারকে বোঝাতে হবে যে, রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়া তাদের আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্যই প্রয়োজন।
চীন ও ভারতের ওপর চাপ ও সহযোগিতা: মিয়ানমারের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব রয়েছে চীন এবং ভারতের। বাংলাদেশকে এই দুই প্রতিবেশী দেশের সাথে এমন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দরকষাকষি করতে হবে যাতে তারা মিয়ানমারকে রোহিঙ্গা ফেরত নিতে বাধ্য করে। শুধু অনুরোধ নয়, কূটনৈতিক স্বার্থের বিনিময়ে হলেও চীনকে এই প্রক্রিয়ায় সরাসরি গ্যারান্টার বা মধ্যস্থতাকারী বানাতে হবে।
আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের শর্ত পরিবর্তন: জাতিসংঘ বা যেকোনো বিদেশি প্রতিনিধি দল যখনই বাংলাদেশ সফরে আসবে, তাদের স্পষ্ট জানিয়ে দিতে হবে—”শুধু কক্সবাজারে ছবি তোলা নয়, মিয়ানমারের ওপর কী কার্যকর নিষেধাজ্ঞা বা চাপ আপনারা তৈরি করেছেন, তার হিসাব দিন।” ক্যাম্প পরিদর্শনকে পর্যটনে রূপান্তর করতে দেওয়া যাবে না।
এনজিওদের কঠোর জবাবদিহিতা: ক্যাম্পে কর্মরত দেশি-বিদেশি এনজিওগুলোর কার্যক্রমের ওপর সরকারের কঠোর নজরদারি ও অডিট নিশ্চিত করতে হবে। যেসব এনজিও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করছে বা উস্কানি দিচ্ছে, তাদের লাইসেন্স বাতিল করে দেশ থেকে বের করে দিতে হবে। তহবিলের সিংহভাগ যেন রোহিঙ্গাদের সরাসরি কল্যাণে এবং স্থানীয় পরিবেশ পুনরুদ্ধারে খরচ হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
আন্তর্জাতিক আদালতের (ওঈঔ/ওঈঈ) রায় কার্যকর করার চাপ: আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে চলমান গণহত্যার মামলার রায় যাতে দ্রুত কার্যকর হয়, সেজন্য ওআইসি (ঙওঈ) এবং অন্যান্য মুসলিম ও পশ্চিমা দেশগুলোকে সাথে নিয়ে বিশ্বমঞ্চে আইনি চাপ অব্যাহত রাখতে হবে।
রোহিঙ্গা সংকট কেবল একটি মানবিক সমস্যা নয়, এটি বাংলাদেশের অস্তিত্ব, অর্থনীতি এবং নিরাপত্তার ওপর এক বিশাল আঘাত। বছরের পর বছর ধরে জাতিসংঘ বা বিদেশি প্রতিনিধিদের ক্যাম্প পরিদর্শনের নাটক এবং এনজিওদের কোটি কোটি ডলারের ফান্ডের খেলা এই সমস্যার সমাধান দিতে পারবে না। কারণ, সমস্যাটি বাংলাদেশে নয়, সমস্যাটি মিয়ানমারে।
বাঙালি প্রবাদের সেই সত্যকে ধারণ করে আমাদের বুঝতে হবে যে, মাথায় মলম লাগিয়ে পাচার ঘা সারানো যাবে না। মিয়ানমার সরকারের সাথে সরাসরি, কঠোর এবং সুনির্দিষ্ট দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ও আন্তর্জাতিক বাস্তবসম্মত চাপই এই ক্ষতের একমাত্র ওষুধ। বাংলাদেশ যদি এখনই এই আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের অসার গোলকধাঁধা থেকে বের হয়ে মূল সমস্যার মূলে আঘাত করতে না পারে, তবে এনজিওদের লাভ হতে থাকবে, আর দিনশেষে আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমি এক দীর্ঘমেয়াদি এবং অপরিবর্তনীয় ক্ষতির অতল গহ্বরে তলিয়ে যাবে।

লেখক: মহাসচিব, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম জাতীয় কমিটি ও চেয়ারম্যান পালংখালী ইউনিয়ন, পরিষদ, উখিয়া, কক্সবাজার।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
bdit.com.bd