মিজানুর রহমান মিজান
মা অতি ছোট একটি শব্দ। কিন্তু এ ছোট শব্দটির মধ্যে রয়েছে অপরিসীম নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, গভীর মমত্ববোধ, মোহনীয় সুরের এক শ্রদ্ধাবিজড়িত আদর-যত্নের অতুলনীয়তায় ভরপুর ব্যঞ্জনা। ‘মা’ শব্দটি উচ্চারণের ক্ষেত্রে কতই না মধুরতা বিগলিত হয় তা কল্পনাই করা সম্ভব, কিন্তু ভাষায় প্রকাশ করা অত্যন্ত দুরূহ ব্যাপার বলে মনে হয় আমার কাছে। ‘মা’ শব্দের ঝংকার হৃদ-মন্দিরে তোলে অপূর্ব সুর লহরী, যার ব্যাপ্তি অনেক গভীরে প্রোথিত শেকড় সন্ধানীতে নিমগ্নতায় পরিব্যাপ্ত। মায়ের সান্নিধ্যে থাকা সন্তান সর্বক্ষেত্রে পরিতৃপ্তির আঁচলে বাঁধা একটি অপূর্ব লীলাময় জীবনের অধিকারী। বলছিলাম আমার মায়ের কথা।
আমি আজ জীবন সায়াহ্নের দ্বারপ্রান্তে। সুতরাং মায়ের বয়স কতটুকু তা সম্মানিত পাঠকবৃন্দের অনুমিত হবার ক্ষেত্রে কোনো প্রকার ধোঁয়াশাবিহীন পরিষ্কার একটি ধারণাবোধ সহজিয়া ব্যাপার। আমি মাতাপিতার একমাত্র পুত্রসন্তান। সুতরাং মা-বাবার কাছে আমার আদর-সোহাগের, যত্নের, লালনের কেমন ছিলাম, আছি তা বলাবাহুল্য। বাবাকে হারালাম সে ২০০৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর। হারিয়ে বটবৃক্ষের ছায়াহীন কত দুঃসহ জীবন চলার পথ পাড়ি দিয়েছি তা এখানে নাইবা বললাম। বলবো, “অন্য কোথাও, অন্যখানে”। আজ মায়ের কথা বলা আমার একান্ত ইচ্ছা ও দৃঢ়তর প্রত্যাশা। মায়ের কাছে প্রতিটি সন্তান সারাটি জীবন সেই যে শিশু, সেই শিশু হিসাবেই মা লালন করেন, বুকে ধারণ করে যান শ্বাস-প্রশ্বাস যতক্ষণ তাঁর দেহে বহমান থাকে।
মা বর্তমানে বয়সের ভারে ন্যুব্জ। কথাবার্তা অনেকটা অসংলগ্ন। দাঁত নেই একটিও। কথাবার্তা অনেক সময় বোঝাই যায় না। কিন্তু অহরহ বলার চেষ্টা করেন, অনেক কিছু অনুমিত হয়। আবার কোনো কোনো কথা সুস্পষ্ট বোঝাও যায়। আমি চলমান জীবনযাত্রার আর দুনিয়াবি কাজকর্মে অতি প্রত্যুষে ঘর ছেড়ে বের হই নিয়মিত রুটিনমাফিক। বাড়ি ফিরি বেলা ১২/১টায়। আবার ফিরে আসি ২/৩টায় আহরণ করতে রুটিরুজির ধান্দায়। প্রতিনিয়ত ফিরে যাই রাত দশটায়। রাতের বেলা গিয়ে দেখি অনেকদিন ঘুমিয়ে পড়েছেন। সাক্ষাৎ হয় না। দুপুরে একবারই সাক্ষাতের সময়।
আমি যখন কলেজে পড়ি, বাড়ি আসতাম রাত ১/১২টায়। এসে দেখতাম মা কুপি বাতি বা হারিকেন জ্বালিয়ে বসে আছেন আমার পথপানে চেয়ে। কখন আমি আসি, তাঁর রোজকারের অপেক্ষার অবসানের নিমিত্তে। গৃহে ঢুকতাম মা-পুত্র একসাথে। দিতেন ভাতের থালা এগিয়ে। আমি অপলক নেত্রে চেয়ে থাকতাম মায়ের হাসিমাখা মুখের পানে। আমার দেখা যেন শেষ হতো না, তৃপ্ত হতাম না। একটি অতৃপ্তি যেন আমাকে তাড়া করতো বারবার, প্রতিবার। কী জাদুমাখা হাতের ছোঁয়া সমৃদ্ধ ভাত, তরকারি! কত যত্নে, আদরমিশ্রিত শব্দবাণে বলতেন, “বাবা এটি আরেকটু নাও, ভালো লাগবে। ওটি হয়তো তোমার মনের মতো হয়নি।” অনেক সময় অকারণে রাগান্বিত হতাম। সে কী কাকুতি, আদর আমার মায়ের! কখনও বিরক্ত হতেন না।
পাঠক, হয়তো আপনারা বিরক্ত হতে পারেন। সবার মা-ই তো এমন হয়। তা এখানে বলার এমন কী নতুনত্ব আছে, নিগূঢ় রহস্য রয়েছে? আমি অকপটে বলতে পারি, হ্যাঁ আছে। রয়েছে আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শিক্ষণীয়। যাঁদের মা নেই, তাঁরা প্রতিনিয়ত বেদনার স্বাদে, ভারে আপেক্ষিত। প্রত্যেকের মা-ই মা। অনেকে যখন মাকে পরিণত বয়সে স্ত্রী, পুত্র, কন্যার লোভাতুর মায়া-মতায় ভুলে যান, কষ্ট দেন—সেটা কতটুকু যুক্তিযুক্ত হয়? মা কী বেদনা অনুভব করেন তা, “বুঝিবে সে কিসে… দংশেনি যারে”।
এইতো মাসখানেক পূর্বে আমি যখন দুপুরের আহার সমাপনান্তে না বলে চলে আসতে ঘর থেকে বের হয়েছি, দেখি মা পিছন পিছন আমাকে ডাকছেন অস্পষ্ট সুরে। তাকালাম পিছন ফিরে। এগিয়ে গেলাম মায়ের একেবারে নিকটে। আমাকে শুধালেন, “চলে যাচ্ছ কি? তুমি গেলে যতক্ষণ দেখা যায় ততক্ষণ তোমার পিছন দিকে চেয়ে থাকি যে আমি”। আমি আজ প্রৌঢ়ত্বে উপনীত। তারপরও মা আমাকে ভাবছেন সেই আগেকার শিশু বা কৈশোরের মতো। আমার চোখ দুটি হয়ে ওঠে মুহূর্তে অশ্রুসিক্ত। আমি মায়ের কাছে সে হিসেবে থাকাতে। এ আনন্দের বন্যা আমিই বুঝি আমার মতো। যিনি আমার পরম শ্রদ্ধেয় মা জননী।
আমরা প্রত্যেকেই প্রত্যেক মায়ের কাছে সেই ছোট্ট খোকাটি হয়ে বেঁচে থাকতে পরম আনন্দ অনুভূত হয়। আবার পরক্ষণেই মনে হলো অন্য রকম অনুভূতি। হাসলাম প্রাণ ভরে। কতই আনন্দের জোয়ারে ভেসে। মায়ের তুলনা মা-ই। সন্তানের জন্য যে মায়েরা নিঃস্বার্থে সারাটি জীবন ভালোবাসা, আদর, সোহাগ বুকে ধারণ করে সংরক্ষিত রাখেন অনিমেষে, অনায়াসে। এমনকি জীবন বিপন্ন করতে দ্বিধান্বিত হন না মোটেই।
এ ঘটনার চারদিন পর আমি ফজরের নামাজ সমাপ্ত করে বিছানায় বসে আছি। চায়ের অপেক্ষায়। চা পান করেই বেরিয়ে যাব আমার কর্মস্থলে। দেখলাম মা বেরিয়ে আসছেন নাতি-নাতনিকে ঘুমন্ত রেখে চুপিসারে। আমি অবাক হয়ে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি, তিনি কী করেন বা কেন বের হলেন জানার উদগ্র বাসনায়। নিজে সঠিকভাবে হাঁটা-চলা প্রায় অসম্ভব। আমার মেয়েকে নিয়ে বের হন সাধারণত, নতুবা পড়ে যাবার ভয় সর্বক্ষণ। দেখলাম ঘরের সিঁড়ির নীচে যাচ্ছেন। আমি নীরবে অনুসরণ করতে লাগলাম। এক হাতে সিঁড়ির রেলিং ধরে অপর হাতে কী যেন অনুসন্ধান করছেন। জিজ্ঞেস করলাম, কী খুঁজছেন? উত্তর দিলেন, “আমার জন্য চা তৈরি করতে লাকড়ি খুঁজছি।” ধরলাম ঝাঁপটিয়ে, “আপনার শারীরিক অবস্থা মোটেই ভালো নয়। তাছাড়া আমার চা তৈরি হচ্ছে। তুমি কেন চা দেবে বা দেবার প্রচেষ্টায় আছ?” বললেন, “বহুদিন হয়ে গেল তোমাকে চা দিতে পারিনি। আমার মন মানছে না।”
হায়রে গর্ভধারিণী মা! সন্তানের জন্য এত মায়া, মহব্বত, ভালোবাসা!
আর আমরা সন্তানরা সে মাকে ভুলে যাই, অনাদর, অবহেলা করি তাঁদের শেষ বয়সে।
এই আমার মা, এই আমার জননী, গর্ভধারিণী। মা, মা, মা।
আল্লাহ, তোমার রহমতের ছায় রেখে আমার মায়ের জন্য কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করছি—দীর্ঘজীবী, সুস্থ রাখতে এবং সকল গোনাহ মাফ করে দিতে। আমিন।