হারাধন সূত্রধর, পূর্বধলা (নেত্রকোনা) প্রতিনিধি:
বাইসাইকেলে ঘুরে আর ক্রাচে ভর দিয়ে দীর্ঘ ৪১ বছর ধরে পাঠকের দ্বারে দ্বারে পত্রিকা পৌঁছে দিচ্ছেন নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার রাজাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মো. আবুল কাশেম (৫৩)। অসুস্থতা কিংবা জীবনসংগ্রাম—কোনো কিছুই দমাতে পারেনি তাকে। প্রতিদিন ‘আজকের গরম খবর আছে’ বলে পাঠকের হাতে পত্রিকা তুলে দেওয়াই তার জীবনযাত্রা।
আজ মঙ্গলবার (০ ৪ আগস্ট) দুপুর তিনটার দিকে পূর্বধলা উপজেলা যুব উন্নয়ন কার্যালয়ে ক্রাচে ভর দিয়ে পত্রিকা দিতে আসেন আবুল কাশেম। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে পত্রিকা বিলির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান (গত ১৬ মার্চ ২০২৬ ইং) নেত্রকোনা থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় পূর্বধলায় ফেরার পথে এক সড়ক দুর্ঘটনায় তার শরীর ও পায়ে গুরুতর আঘাত লাগে। টানা চার মাস বাড়িতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার প্রচুর টাকা ব্যয় হয়।
পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি আবুল কাশেম বলেন, “দীর্ঘদিন কর্মহীন থাকায় সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছিল। তাই বাধ্য হয়েই পুরোপুরি সুস্থ না হয়েও ক্রাচে ভর দিয়ে আবার পত্রিকা বিক্রিতে নামতে হয়েছে।”
১৯৮৪ সাল থেকে শুরু হওয়া এই দীর্ঘ পথচলায় প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত পত্রিকা বিলি করেন তিনি। এরপর বিকেল ৫টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত ঘুরে ঘুরে বিক্রির টাকা তোলেন। সব মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৮ থেকে ১০ কিলোমিটার পথ সাইকেল চালিয়ে বা হেঁটে তাকে অতিক্রম করতে হয়। শরীর সায় না দিলেও জীবিকার তাগিদে যতদিন বেঁচে থাকবেন, ততদিন এই কাজ চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
ব্যক্তিগত জীবনে দুই ছেলে ও এক কন্যাসন্তানের জনক আবুল কাশেমের সন্তানেরা সকলেই পড়াশোনা করছে। তবে বর্তমান সময়ে পত্রিকার বাজারের মন্দাভাব তাকে চিন্তিত করে তুলেছে।
ডিজিটাল মাধ্যমের প্রভাবে পত্রিকা বিক্রির সার্বিক চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, “অনলাইন ও মাল্টিমিডিয়া নিউজের কারণে ছাপা পত্রিকার পাঠক অনেকটাই কমে গেছে। একসময় মানুষ পত্রিকার জন্য অপেক্ষা করত, আর এখন অনীহার কারণে অনেকে পত্রিকা নিতে চান না। বর্তমানে দিনে মাত্র ১৪০ থেকে ১৬০ কপি পত্রিকা বিক্রি করতে পারি। কমিশন হিসেবে পত্রিকা আনায় অবিক্রীত পত্রিকার লোকসান নিজেকেই বহন করতে হয়।”
রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে দিনরাত পরিশ্রম করা সংবাদপত্র হকারদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সরকারের হস্তক্ষেপ দাবি জানান এই প্রবীণ পত্রিকা বিক্রেতা।