• রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:৩১ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]

গরিব ও ক্ষুধার্তদের পাশে দাঁড়ানোই সত্যিকারের শক্তি

Reporter Name / ১২৬ Time View
Update : মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

 

লেখক: মুন্সি শাহাব:

ভোরের আলো ফোটার আগেই যাদের জীবন শুরু হয়, তাদের কাহিনী কেউ শিরোনামে আনে না। কাঁচা ঘরের ফাঁক দিয়ে ঢোকার হিমেল বাতাস, আধপেটা খাবার আর অনিশ্চিত আগামী। এই নিয়েই গরিব মানুষের প্রতিদিনের সংগ্রাম। তারা চায় না করুণা, চায় শুধু নিরাপত্তা, চায় স্বাভাবিক জীবন। কিন্তু সমাজের চোখে তারা প্রায়ই অদৃশ্য।

ক্ষুধা মানুষের মুখ বন্ধ করে দেয়, কিন্তু চোখে রাখে প্রশ্ন—আজ বেঁচে থাকা সম্ভব হবে তো? সন্তানের জন্য একমুঠো ভাত জুটবে কি? এই প্রশ্নের কোনো সহজ উত্তর নেই। ফলে দিনের পর দিন তাদের জীবন কঠিন বাস্তবতার ভাঁজে চাপা পড়ে থাকে।

শিশুদের কান্না সবচেয়ে বেশি নাড়া দেয়। বই-খাতার বয়সে যাদের হাতে ধরা পড়ে শ্রমের ভার, তারা জানে না রাজনীতি কী। স্কুলের দরজা তাদের কাছে শুধুই দূরের প্রতীক; প্রতিদিনের বাস্তব হলো দারিদ্র্য ও অসম সুযোগের কঠিন খেলায় বেঁচে থাকা। এই শিশুরা রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতির বাইরে পড়ে গেছে—তাদের স্বপ্ন ঝরে যাচ্ছে অনাগত কালচক্রে।

নির্বাচনের সময় গরিব মানুষ আলোচনার কেন্দ্রে আসে। তখন তারা হয়ে ওঠে কেবল সংখ্যা, ভোটের হিসাব, একটি প্রার্থী বা দলের পল্টন। ভোট শেষ হলে তাদের কণ্ঠ আবার হারিয়ে যায়, উন্নয়ন বড় প্রকল্পে সীমাবদ্ধ থাকে, কিন্তু তাদের ঘরে আসে না। তারা থেকে যায় সেই একই হাহাকার আর অবহেলার ভেতরে।

দারিদ্র্য কোনো অপরাধ নয়। লজ্জা হলো এমন সমাজের, যে সমাজ গরিব মানুষের শ্রম নেয়, কিন্তু তাদের মর্যাদা দেয় না। রাষ্ট্র যদি তার দুর্বল নাগরিকদের পাশে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়, তবে সব উন্নয়ন প্রকল্পই অর্থহীন ও অমর্যাদাপূর্ণ হয়ে যায়। গরিব মানুষের শ্রম, আশা ও স্বপ্ন—সবই তখন অসহায়।

আজ সময় এসেছে দায়িত্ব নেওয়ার। ক্ষুধার পাশে দাঁড়িয়ে দারিদ্র্যের কণ্ঠকে নীরব নয়, নীতি নির্ধারণের টেবিলে প্রতিফলিত করার। গরিব মানুষের জন্য ন্যায্যতা ও সম্মান নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মূল কর্তব্য। কারণ রাষ্ট্রের মানবিকতা এবং নৈতিক শক্তি সেই সমাজের প্রকৃত শক্তি, এবং গরিব মানুষের চোখের জল মুছতে ব্যর্থ রাষ্ট্র কখনোই সৎ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হতে পারে না।

গরিব মানুষের পাশে দাঁড়ানো দয়া নয়। এটি রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। তাদের জীবনকে মর্যাদা দেওয়া, তাদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করা, এবং তাদের স্বপ্নকে বাস্তব করে তোলা এই দায়িত্ব পালন করলেই একটি সমাজ সত্যিকারের মানবিক, শক্তিশালী এবং সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের দিকে এগোতে পারে।

গরিব মানুষের চোখের জল যদি সমাজ ও রাষ্ট্রের বিবেককে জাগাতে পারে, তাহলে আমরা সত্যিই বুঝতে পারব রাজনীতি কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়, মানুষের কল্যাণের দায়ও। আর সেই দায়ই আমাদের সবাইকে নীরব থেকে সচেতন নাগরিকে রূপান্তরিত করবে।
একজন দরিদ্র মানুষের কথা :-
“আমি গরিব, কিন্তু অদৃশ্য হতে চাই না”
আমি কোনো বড় কথা জানি না। রাজনীতি বুঝি না, ভাষণ দিতে পারি না। আমি শুধু জানি। প্রতিদিন সকালে ঘুম ভাঙলেই প্রথম যে প্রশ্নটা আসে, সেটা হলো আজ খাবার জুটবে তো? আমার সন্তানের মুখে একমুঠো ভাত দিতে পারব তো?

ভোরের আগে ঘুম ভাঙে আমার। কাজের খোঁজে বের হই, কিন্তু কাজ সব দিন মেলে না। মজুরি পাই, আবার অনেক দিন পাই না। পেটের ক্ষুধা বোঝে না আজ রবিবার না সোমবার। ক্ষুধা শুধু জানে। সে আছে, আর আমি অসহায়।

আমার ঘরটা ঘর না, একটা ঠাঁই মাত্র। বৃষ্টি নামলে ঘুম হয় না, শীতে শিশুরা কাঁপে। তখন বুকের ভেতরটা ভেঙে যায়। বাবা হয়ে সন্তানের জন্য কিছু করতে না পারার যন্ত্রণা সবচেয়ে বড় শাস্তি।

আমার ছেলেমেয়েরা স্কুলে যায় না। ইচ্ছে নেই বলে না, সামর্থ্য নেই বলে। বই-খাতার বয়সে ওদের হাতে কাজের ভার তুলে দিতে হয়েছে। ওরা হাসতে জানে, কিন্তু স্বপ্ন দেখতে শেখেনি। স্বপ্ন দেখার সুযোগটা ওদের কেউ দেয়নি।

নির্বাচনের সময় অনেকেই আসে। বলে ভোট দাও, সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি ভোট দিই। কিন্তু ভোট দেওয়ার পর আমার জীবনে কিছু বদলায় না। আমি আবার সেই পুরোনো মানুষ, সেই পুরোনো ক্ষুধা, সেই পুরোনো অপেক্ষা।

আমি দয়া চাই না। আমি হাত পাততে চাই না। আমি চাই কাজ ন্যায্য কাজ। চাই সম্মান মানুষ হিসেবে বাঁচার সম্মান। আমার সন্তান যেন অন্তত মানুষ হিসেবে বড় হতে পারে, এইটুকুই আমার স্বপ্ন।

আমি গরিব বলে কি মানুষ নই? আমার কষ্ট কি কষ্ট নয়? যদি রাষ্ট্র আমাকে মানুষ বলে মানে, তাহলে আমাকে চোখে দেখুক, কণ্ঠে শুনুক। আমাকে অদৃশ্য করে রাখবেন না।

আমি শুধু চাই আমার চোখের জল যেন কারও বিবেক জাগায়। আমার ক্ষুধা যেন কোনো নীতির পাতায় জায়গা পায়। তাহলেই বুঝব, আমি শুধু ভোটার নই। আমি এই রাষ্ট্রেরই একজন মানুষ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
bdit.com.bd