মো: বায়েজিদ বোস্তামী, বিশেষ প্রতিনিধি, কিশোরগঞ্জ:
আজ রক্তস্নাত ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ইং, ৮ই ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ । রফিক, শফিক, জব্বারদের বুকের তাজা রক্তে কেনা আমাদের প্রিয় বাংলা বর্ণমালা আর সেই মহান ভাষা শহীদদের স্মরণে আজ পুরো জাতি যখন নতমস্তকে দাঁড়িয়ে, ঠিক তখনই কিশোরগঞ্জের মাটি দেখল এক লজ্জিত ও ন্যাক্কারজনক চিত্র। জেলার ঐতিহ্যবাহী গুরুদয়াল সরকারি কলেজ মাঠে অবস্থিত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আজ পুষ্পস্তবক অর্পণের শ্রদ্ধার বদলে দেখা গেল ‘লুটপাটের’ মহোৎসব।
বিবেকের চরম অধঃপতন:
সকালে যখন ভাষা শহীদদের প্রতি নিবেদন করা ফুলের সুবাসে বাতাস পবিত্র হওয়ার কথা, ঠিক তখনই সেই পবিত্রতা লুটে নিল একদল উশৃঙ্খল জনতা। ছবির প্রতিটি ফ্রেমে লুকিয়ে আছে আমাদের নৈতিক পরাজয়। সেখানে দেখা যাচ্ছে, শিশু থেকে শুরু করে আধুনিক পোশাকে সজ্জিত তরুণ-তরুণী এবং এমনকি বয়স্ক নারী-পুরুষরাও নির্লজ্জের মতো শহীদ বেদীতে রাখা শ্রদ্ধাঞ্জলির ফুলগুলো ছিঁড়ে নিয়ে যাচ্ছেন। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর আজ প্রশ্ন জাগে—আমাদের মনুষ্যত্ব কতটুকু নিচে নেমেছে যে আমরা শহীদদের সম্মানের শেষ স্মৃতিটুকুও লুণ্ঠন করছি ?
সাংবাদিক হিসেবে পর্যবেক্ষণ:
একজন সংবাদকর্মী হিসেবে আজকের ঘটনায় মনে হলো, আমরা কি সত্যিই ভাষা শহীদদের রক্তকে সম্মান করতে শিখেছি ? যেখানে শহীদ মিনার হওয়ার কথা ছিল আত্মত্যাগের প্রতীক, সেখানে এটি পরিণত হয়েছে স্বার্থপরতার প্রদর্শনীতে। কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন সোস্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত ছবিতে স্পষ্ট দেখা যায়, কার আগে কে ফুল নিয়ে যাবে—সেই হিংস্র প্রতিযোগিতায় হারিয়ে গেছে ভাষা দিবসের গাম্ভীর্য। এটি শুধু একটি ছবি নয়, বরং আমাদের সামাজিক অবক্ষয়ের এক জ্বলন্ত দালিল।
জাতির কাছে প্রশ্ন ?
যেখানে সারা বিশ্ব আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে আমাদের সম্মান দিচ্ছে, সেখানে আমাদের এই তরুণ প্রজন্ম আর মুরব্বিরা কী বার্তা দিচ্ছেন ? ফুল লুট করে হাত রাঙানো হয়তো সহজ, কিন্তু এই যে শহীদদের আত্মার প্রতি অবমাননার কালো দাগ আমাদের হৃদয়ে লাগল, তা কি কোনোদিন কখনো কি মুছবে ?
আজ শহীদ মিনার শুধু বেদীর জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকেনি, দাঁড়িয়ে আছে আমাদের বিবেকের কাঠগড়ায়। স্বাধীনতার পর আমাদের অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়তো হয়েছে, কিন্তু আজকের এই দৃশ্য প্রমাণ করে আমরা অন্তরে কঙ্কালসার হয়ে গেছি।
শহীদ মিনারের এই পবিত্রতা রক্ষা করা কি শুধু প্রশাসনের দায়িত্ব ? দেশের সুনাগরিক হিসেবে ও দেশ প্রেমিক হিসেবে আমাদের কি কোনোই দায়বদ্ধতা নেই ?
আজকের এই ৮ই ফাল্গুনে আমাদের শপথ হোক—শহীদ মিনার যেন আর কোনোদিন এমন লুণ্ঠনের সাক্ষী না হয়। অমর একুশের চেতনা হোক প্রকৃত শ্রদ্ধার, স্বার্থপরতার নয়।