ডাক্তারি জীবনে মাঝে মাঝে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন মনে হয় হাজার প্রতিকূলতার মাঝেও মানুষ বাঁচার জন্য লড়ে যায়। চিকিৎসকরা শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করে যান আর শেষ রক্ষা করেন পরম করুণাময়।
৩৫ বছর বয়সী মিজানুর রহমান সাহেব আমাদের হাসপাতালে ডেঙ্গু নিয়ে ভর্তি হন ৩১ আগস্ট। পেশায় তিনি ঢাকার একটি টেক্সটাইল ফ্যাক্টরিতে কর্মরত। ঢাকাতেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে নিজের বাড়ি পাটগ্রাম, লালমনিরহাটে ফিরে আসেন। এরপরের গল্পটা রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের।
ভর্তির পর তিনি যখন আমাদের কাছে তার আগের রিপোর্টগুলো দেখান, তখন তার — প্ল্যাটিলেট ছিল ৩৫,০০০ (স্বাভাবিক : ১,৫০,০০০ – ৪,০০,০০০) সংখ্যাটা নিঃসন্দেহে কম। কিন্তু ডেঙ্গু রোগীর ক্ষেত্রে এমন প্ল্যাটিলেট খুব অস্বাভাবিক কিছু নয়। সবচেয়ে বড় কথা তখন তার পালস, ব্লাড প্রেশার এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণগুলো ভালো ছিল। তাই আমরা প্রথমদিকে খুব বেশি চিন্তিত ছিলাম না। কিন্তু পরদিনের সকালটা আমাদের জন্য অন্যরকম ছিল। রিপোর্ট হাতে নিয়ে দেখি প্ল্যাটিলেট মাত্র (৫,০০০) পাঁচ হাজার। এর সঙ্গে শুরু হয়েছে “কালো পায়খানা (Melaena) অর্থাৎ শরীরের ভেতরে রক্তক্ষরণ” শুরু হয়েছে (Concealed haemorrhage) । সেই মুহূর্তে আর সময় নষ্ট করার সুযোগ ছিল না। আমরা দ্রুত আমাদের ইউনিটের প্রফেসর স্যারদের শরণাপন্ন হলাম। স্যারদের পরামর্শে RDP (Random Donor Platelet) দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলো। কিন্তু চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর শুরু হলো আরেকটি যুদ্ধ, ডোনার কোথায়?
হাসপাতালে যোগাযোগ করা হলো। বিভিন্ন ব্লাড ডোনার সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলো। কিন্তু এত অল্প সময়ে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ডোনার পাওয়া যাচ্ছিল না। আর ঠিক তখনই সামনে ভেসে উঠলো একজন মায়ের কান্নাভেজা মুখ! সন্তানকে বাঁচানোর আকুতি নিয়ে তিনি আমাদের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তার সেই অসহায় চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আমরা কীভাবে থেমে থাকি? আমাদের ইন্টার্ন ডাক্তাররা, সহকর্মীরা যে যার জায়গা থেকে যোগাযোগ শুরু করলেন। আমিও আমার পরিচিতদের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। আমাদের এক ইন্টার্ন ডাক্তার, এলাকার এক ছোট ভাইসহ দ্রুত কয়েকজন ডোনারের ব্যবস্থা হলো। একজনের জন্য অনেকগুলো মানুষ একসঙ্গে ছুটে দাঁড়ালেন। দ্রুত কয়েক ইউনিট RDP দেওয়া হলো। কিন্তু গল্প তখনও শেষ হয়নি। প্রায় তিন দিনে ৭ ইউনিট প্ল্যাটিলেট দেওয়ার পরও প্ল্যাটিলেট কাউন্ট উঠল মাত্র ৬,০০০ এ। ভাবুন একবার — ৭ ইউনিট প্ল্যাটিলেট দেওয়ার পরও ৫,০০০ থেকে মাত্র ৬,০০০! স্বাভাবিকভাবেই আমাদের উদ্বেগ আরও বাড়ল। তবে আমাদের ইউনিটের স্যার এবং Hematology বিভাগের স্যারদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তে চিকিৎসায় আরও কিছু পরিবর্তন আনা হলো। একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমাদের আশ্বস্ত করছিল রোগীর Vitals ভালো ছিল এবং Hematocrit ঠিক ছিল। তাই এবার আমাদের করতে হলো অপেক্ষা। ( Wait and see for the natural history of the disease.) চিকিৎসার পাশাপাশি অপেক্ষা! আর সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা। এই কয়েকটি দিন হয়তো রোগীর পরিবারের জন্য ছিল সবচেয়ে দীর্ঘসময়। আমরা দিনে যতবার রোগীকে দেখতে যেতাম, তার স্বজনদের একই প্রশ্ন — প্ল্যাটিলেট বাড়ে না কেন, ডাক্তার সাহেব? কিন্তু সব প্রশ্নের উত্তর সবসময় চিকিৎসকের হাতে থাকে না। অনেক সময় আমাদেরও অপেক্ষা করতে হয়। অনেক সময় আমরাও প্রার্থনা করি। অনেক সময় বিজ্ঞান তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করার পর প্রকৃতির নিজের গতিপথের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। তবে এই পুরো সময়টাতে যে বিষয়টি আমাদের সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে, তা হলো মিজানুর রহমান সাহেবের নিজের মনোবল। এত কম প্ল্যাটিলেট, রক্তক্ষরণের আশঙ্কা, পরিবারের উৎকণ্ঠা, বারবার রক্ত পরীক্ষা — তারপরও তাকে দেখে একবারও মনে হয়নি তিনি হাল ছেড়ে দিয়েছেন। তার আত্মবিশ্বাস ছিল প্রবল। অবশেষে সেই অপেক্ষার অবসান হলো। প্ল্যাটিলেট এসে দাঁড়াল ২৫,০০০ এ। আমরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। মনে হলো, “আলহামদুলিল্লাহ” এবার হয়তো প্ল্যাটিলেট বাড়তেই থাকবে, ইনশাআল্লাহ।
পরদিন ৭০,০০০ আর তারপর দিন ৯৫,০০০ প্ল্যাটিলেট আরও বেড়েছে। যে মানুষটির প্ল্যাটিলেট একসময় ৫,০০০ এ নেমে গিয়েছিল, আজ তাকে আমরা হাসিমুখে বিদায় জানাতে পেরেছি। “বিদায়ের সময় রোগী ও তার স্বজনদের মুখের সেই কৃতজ্ঞতার হাসি দেখে মনে হলো” গত কয়েকদিনের আমাদের সব উৎকণ্ঠা, সব দুশ্চিন্তা, সব না-বলা প্রশ্নের উত্তর যেন সেই একটি মাত্র হাসির মধ্যেই লুকিয়ে আছে। হয়তো এটাই ডাক্তারি জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। কোনো বড় পুরস্কার নয়। কোনো বাহবা নয়। কোনো স্বীকৃতিও নয়। শুধু একজন রোগীকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরতে দেখা। একজন মায়ের চোখের পানি হাসিতে পরিণত হতে দেখা। আর মনে মনে বলা “আলহামদুলিল্লাহ” আমরা আমাদের সর্বোচ্চটা চেষ্টা করেছি। বাকিটা তিঁনি করেছেন।
এই গল্প শুধু মিজানুর রহমান সাহেবের নয়। এটি একজন রোগীর হার না মানার গল্প। এটি তার পরিবারের অপেক্ষা ও ভালোবাসার গল্প। এটি আমাদের ইন্টার্ন ও সহকর্মীদের মানবিকতার গল্প। এটি আমাদের মেডিসিন ইউনিট ও Hematology বিভাগের স্যারদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার গল্প। এটি অচেনা মানুষের জন্য রক্ত দিতে ছুটে আসা কিছু মানুষের গল্প। আর সর্বোপরি এটি আশার গল্প। কারণ কখনো কখনো চিকিৎসাবিজ্ঞানের সব হিসাব-নিকাশের মাঝেও একটি জিনিসকে হারাতে নেই। তা হলো আশা। “আলহামদুলিল্লাহ” আল্লাহ মিজানুর রহমান সাহেবকে সম্পূর্ণ সুস্থতা দান করুন। আমিন।
লেখকঃ ডাঃ মোঃ আবুল কাশেম
সহকারী রেজিস্ট্রার (মেডিসিন)
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।