পূর্বধলা (নেত্রকোনা) প্রতিনিধি:
নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার ২৩ জন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের বিরুদ্ধে ছুটি বিধি লঙ্ঘন করে টাঙ্গাইলের মধুপুরে গিয়ে সাবেক উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে সংবর্ধনা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত শিক্ষকদের মধ্যে ১৪ জন প্রধান শিক্ষক এবং ৯ জন সহকারী শিক্ষক।
গত ১৬ আগস্ট মধুপুর উপজেলা শিক্ষা অফিসে এসব শিক্ষককে একসঙ্গে উপস্থিত থাকতে দেখা যায়। তাঁদের কয়েকজন সেই ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।
প্রশ্ন উঠেছে কারা নিয়ম মেনে ছুটি নিয়েছেন, আর কারা নেননি পাশাপাশি ছুটি নিয়ে অন্য জেলায় যাওয়ার ক্ষেত্রে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছিল কি না।
জানা গেছে, পূর্বধলার সাবেক প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মফিদুল হক টাঙ্গাইলের মধুপুরে বদলি হওয়ার পর তাঁকে অভিনন্দন জানাতে পূর্বধলা থেকে শিক্ষকরা সেখানে যান। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ওই ২৩ জন শিক্ষকের মধ্যে ১০ জন নৈমিত্তিক ছুটি (সিএল) নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেলেও বাকি ১৩ জনের ছুটির বিষয়ে কোনো স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
অনুসন্ধানে হাজিরা খাতায় একাধিক অনিয়ম চোখে পড়ে। ১৪ জন প্রধান শিক্ষকের মধ্যে ৭ জনেরই হাজিরা খাতায় নিয়মিত স্বাক্ষর রয়েছে।
খিদিরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রোকন উদ্দিনের হাজিরা খাতায় স্বাক্ষরের ঘরটি ফ্লুইড (হোয়াইট ফ্লুইড) দিয়ে মুছে নিচে লাল কালিতে ‘সিএল’ লেখা দেখা গেছে। এ বিষয়ে টাঙ্গাইল যাওয়া ও ছুটির নিয়ম সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, অনুমতি নেওয়া হয়েছে কি না তা কর্তৃপক্ষ জানে, আপনাকে কেন বলব?
এছাড়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাজিব হোসেন, কালডোয়ার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আফসারী বেগম, খলাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নির্মল সরকার, মেঘশিমুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আমিনুল ইসলাম খান, হ্যাপি বেবি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল ওয়াহাব খান, গোপীনাথকিলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সপ্তর্ষি চন্দ্র এবং নোয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুমন সরকার ছুটি না নিয়েও হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেছেন।
তাঁদের দাবি, সিএল না নিলেও যথাযথ কর্তৃপক্ষের মৌখিক অনুমতি নিয়েই কর্মস্থল ত্যাগ করেছিলেন তাঁরা।
ছুটি না নিয়ে কিংবা মৌখিক অনুমতির ভিত্তিতে শিক্ষকদের অন্য জেলায় যাওয়ার বিষয়টি সরাসরি নাকচ করেছেন উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা ফজলুর রহমান। তিনি জানান, কতজন শিক্ষক নৈমিত্তিক ছুটি নিয়েছেন, সে বিষয়ে তাঁর কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। তবে তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নৈমিত্তিক ছুটি নিয়ে অন্য জেলায় যাওয়ার কোনো বিধান নেই। বিশেষ কোনো প্রয়োজনে অন্য জেলায় যেতে হলে ছুটির আবেদনের সময়ই বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করার নিয়ম রয়েছে।
পূর্বধলার সাবেক প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মফিদুল হকের কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, শিক্ষকরা হঠাৎ করে তাঁর কার্যালয়ে আসেন। তাদের সেখানে আসার বিষয়টি তিনি আগে থেকে জানতেন না। শিক্ষকরা কার্যালয়ে আসার পরই তিনি বিষয়টি জানতে পারেন।
এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মনজুরুল হক প্রথমে প্রতিবেদনটি প্রকাশ না করার অনুরোধ জানান। পরবর্তীতে তিনি বলেন, যদি কোনো অনিয়ম হয়ে থাকে, তবে লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শফিকুল ইসলাম জানান, অভিযোগ পেলে বিষয়টি তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কর্মস্থল ত্যাগ, ছুটি অনুমোদন এবং হাজিরা খাতায় স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে সরকারি বিধিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না তা সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমেই পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।