মোঃ আবু সাঈদ,স্টাফ রিপোর্টার
ঢাকার অন্যতম ব্যস্ত ও জনবহুল এলাকা খিলক্ষেত। তবে বর্তমানে খিলক্ষেত বাজার ও এর আশেপাশের এলাকার চিত্র যেন কোনো এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপের কথা মনে করিয়ে দেয়। সামান্য বৃষ্টি হলেই এখানকার প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি রূপ নেয় কর্দমাক্ত মিনি লেকে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, এই কৃত্রিম বন্যার জন্য আকাশ থেকে পড়া বৃষ্টির জল যতটা না দায়ী, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি দায়ী বছরের পর বছর ধরে চলে আসা প্রশাসনিক ও কাঠামোগত চরম অব্যবস্থাপনা।
হাঁটু পানিতে বন্দি জনজীবন: দুর্ভোগের চিত্র
সরেজমিনে খিলক্ষেত বাজার এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সামান্য বা মাঝারি ধরনের বৃষ্টিপাতেই মূল সড়কে হাঁটুর সমান পানি জমে যাচ্ছে। নোংরা ও দুর্গন্ধযুক্ত এই জল মাড়িয়েই প্রতিদিন যাতায়াত করতে হচ্ছে হাজার হাজার মানুষকে।
ব্যবসায়িক স্থবিরতা: খিলক্ষেত বাজারের ব্যবসায়ীরা পড়েছেন চরম বিপাকে। দোকানে পানি ঢুকে মালামাল নষ্ট হওয়া এখন নিত্যদিনের ঘটনা। জলাবদ্ধতার কারণে ক্রেতারা বাজারে আসতে পারছেন না, যার ফলে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। পণ্যবাহী যানবাহন চলাচলেও তৈরি হয়েছে তীব্র অচলাবস্থা।
শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে ব্যাঘাত: স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী এবং অফিসগামী চাকরিজীবীদের দুর্ভোগের কোনো শেষ নেই। নোংরা পানি মাড়িয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে গিয়ে নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান সময়, বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি।
মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি: জমে থাকা এই দূষিত পানি শুধু যাতায়াতের সমস্যাই তৈরি করছে না, বরং এটি হয়ে উঠেছে নানাবিধ চর্মরোগ এবং পানিবাহিত রোগের উৎস। এছাড়া মশার বংশবিস্তারের জন্য এটি এক আদর্শ প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
সমস্যার মূলে কী?
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, খিলক্ষেতের এই জলাবদ্ধতা কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং এটি পুরোপুরি মানবসৃষ্ট। প্রধান সমস্যাগুলো হলো:
কার্যত অচল ড্রেনেজ ব্যবস্থা: রাস্তার পাশে ড্রেন বা নর্দমা থাকলেও তা ময়লা-আবর্জনা ও পলিথিনে সম্পূর্ণ ভরাট হয়ে গেছে। পানি নিষ্কাশনের কোনো পথ খোলা নেই।
নাগরিক অসচেতনতা: স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের যত্রতত্র প্লাস্টিক, বোতল ও গৃহস্থালির বর্জ্য ফেলার কারণে ড্রেনগুলো অল্প দিনেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব: সিটি কর্পোরেশন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে দীর্ঘ সময় ধরে ড্রেন পরিষ্কার বা সংস্কারের কোনো কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়েনি।
টেকসই সমাধানের পথ: যা করা জরুরি
খিলক্ষেতবাসীকে এই অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে হলে কেবল সাময়িক জোড়াতালি দিয়ে লাভ হবে না। প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী ও সমন্বিত মহাপরিকল্পনা:
জরুরি ভিত্তিতে ড্রেন পরিষ্কার ও সম্প্রসারণ: অবিলম্বে আধুনিক বর্জ্য অপসারণ যন্ত্রের সাহায্যে ড্রেনের ভেতরের সমস্ত আবর্জনা পরিষ্কার করতে হবে এবং পানির প্রবাহ ঠিক রাখতে ড্রেনগুলোর ধারণক্ষমতা বাড়াতে হবে।
রাস্তা উঁচুকরণ ও সংস্কার: খিলক্ষেত বাজারের নিচু রাস্তাগুলোকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে উঁচুকরণ করতে হবে, যেন পানি দ্রুত নেমে যেতে পারে।
স্থায়ী পাম্পিং স্টেশন স্থাপন: ভারী বর্ষণের সময় জমে থাকা পানি দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য পাম্পিং স্টেশন বা শক্তিশালী সেচ পাম্পের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
জনসচেতনতা বৃদ্ধি: স্থানীয় নাগরিক সমাজকে সাথে নিয়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সচেতনতা তৈরি করতে হবে। ‘যত্রতত্র ময়লা ফেলা বন্ধ করুন’এই স্লোগানকে প্রতিটি ঘরে পৌঁছে দিতে হবে।কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ কাম্য খিলক্ষেত ঢাকার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার ও বাণিজ্যিক এলাকা। প্রতি বর্ষায় এই এলাকাটি এভাবে স্থবির হয়ে পড়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগী জনগণের দাবি—ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা যেন আর কালক্ষেপণ না করে দ্রুত মাঠে নামেন।
এখনই যদি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে সামনের দিনগুলোতে সামান্য বৃষ্টিপাতই খিলক্ষেতের জন্য আরও বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে। খিলক্ষেতকে একটি আধুনিক, সচল ও জলাবদ্ধতামুক্ত এলাকা হিসেবে গড়ে তুলতে সম্মিলিত প্রচেষ্টার কোনো বিকল্প নেই।