• বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬, ১২:১৮ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]

নীলফামারীর ল্যাম্পপোস্টের আলোয় বোনা স্বপ্নের সারথি জেলা প্রশাসন: সেনা কর্মকর্তা হতে চাওয়া শিশু নিরবের দায়িত্ব নিলেন ডিসি

Reporter Name / ১১৭ Time View
Update : শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬

নীলফামারী প্রতিনিধি:
অন্ধকার ঘরে কুপির তেল ফুরিয়ে গেলে কী হবে? ভেতরের জ্বলতে থাকা স্বপ্নের আলো তো আর নিভে যেতে দেওয়া যায় না! তাই তো প্রতিদিন সন্ধ্যা নামলেই সাত বছরের একরত্তি শিশু নিরব ছুটে যেত নীলফামারী রেলওয়ে স্টেশনে। স্টেশনের ২ নম্বর প্ল্যাটফর্মের ল্যাম্পপোস্টের সেই আবছা হলদে আলোতেই সে খুঁজতো নিজের ভবিষ্যৎ, বুকে লালন করতো বড় হয়ে একদিন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গৌরবময় কর্মকর্তা হওয়ার স্বপ্ন।
ল্যাম্পপোস্টের নিচে বসে নিরবের এই আলো খোঁজার হৃদয়স্পর্শী গল্পটি সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে তা আলোড়ন সৃষ্টি করে। বিষয়টি নজরে আসে নীলফামারীর মানবিক জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামানের। আর তাতেই বদলে যায় গল্পটি। ল্যাম্পপোস্টের নিচে একা একা লড়াই করা সেই ছোট্ট নিরবের পাশে এবার পরম মমতায় এসে দাঁড়িয়েছে জেলা প্রশাসন।
শুক্রবার (১৭ জুলাই) বিকেলে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান নিজে ছুটে যান নীলফামারী রেলওয়ে স্টেশনের ২ নম্বর প্ল্যাটফর্ম সংলগ্ন নিরবদের সেই জরাজীর্ণ ছোট্ট ঘরে। পরম স্নেহে নিরব ও তার পরিবারের খোঁজখবর নেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে তাদের হাতে খাদ্য সহায়তা তুলে দেন। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় পড়া নিরবের সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে জেলা প্রশাসন এখন তার পড়াশোনা, চিকিৎসা এবং স্থায়ী বাসস্থানের দায়িত্ব নিয়েছে।
যা বললেন জেলা প্রশাসক
ভবিষ্যতের এক সেনা কর্মকর্তাকে গড়ে তোলার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান বলেন:
“গণমাধ্যমে সংবাদটি দেখার পর থেকেই শিশু নিরবের জন্য আমার মনটা কাঁদছিল। বাড়িতে বিদ্যুৎ নেই, কুপির তেল কেনার সামর্থ্য নেই—তবুও পড়াশোনার প্রতি তার এই অদম্য স্পৃহা সত্যি বিস্ময়কর। বড় হয়ে সে দেশের সেবা করতে চায়, সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা হতে চায়। তার এই স্বপ্নকে আমরা কিছুতেই মরে যেতে দিতে পারি না।”
তিনি আরও জানান:
শিক্ষার দায়িত্ব: নিরবের পড়াশোনার প্রতি তীব্র আগ্রহ দেখে সরকারি শিশু সদনের (সরকারি শিশু পরিবার) মাধ্যমে তার সম্পূর্ণ পড়াশোনার দায়িত্ব গ্রহণ করা হয়েছে।
চিকিৎসা সেবা: নিরব বর্তমানে কিছুটা অসুস্থ। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত তার সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
স্থায়ী আবাসন: পরিবারটি বর্তমানে রেলওয়ের জমিতে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে। তাদের একটি স্থায়ী ও নিরাপদ ঠিকানা করে দিতে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে সরকারি খাস জমি খুঁজে স্থায়ী আবাসনের (ঘর) ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মায়ের চোখে আনন্দের অশ্রু
জেলা প্রশাসকের এমন মানবিক ও যুগান্তকারী উদ্যোগে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন নিরবের মা রুপসানা বেগম। সন্তানের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ যেখানে ল্যাম্পপোস্টের আলোর মতো মিটিমিটি জ্বলছিল, সেখানে আজ আশার প্রদীপ জ্বেলে দিয়েছে জেলা প্রশাসন। সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তিনি প্রশাসনের এই উদ্যোগে পরম সানন্দে সম্মতি জানান। একই সাথে তাদের এই কষ্টের জীবনসংগ্রামের কথা গণমাধ্যমে তুলে ধরে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য নীলফামারীর সাংবাদিকদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।
উপস্থিত ছিলেন যাঁরা
মানবিক এই পরিদর্শনের সময় জেলা প্রশাসকের সঙ্গে আরও উপস্থিত ছিলেন:
সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোবাশ্বিরা আমাতুল্লাহ,
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. মনোয়ারুল ইসলাম,
নীলফামারী সরকারি শিশু পরিবার (বালক)-এর উপ-তত্ত্বাবধায়ক শাহ মো. আল আমিন,
নীলফামারী প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নুর আলম,
তথ্য প্রযুক্তি ও সমাজ কল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক মো. আরিফুল ইসলাম আরিফসহ জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্মকর্তাবৃন্দ।
ল্যাম্পপোস্টের আলোয় শুরু হওয়া নিরবের এই সংগ্রামী গল্পটি এখন আর অন্ধকারের গল্প নয়; জেলা প্রশাসনের হাত ধরে তা এখন এক বুক আশা আর আলোয় ফেরার গল্প। সবার প্রত্যাশা, নিরব একদিন সত্যি সত্যিই সবুজ ইউনিফর্ম গায়ে জড়িয়ে দেশের সেবা করবে এবং তার এই লড়াই বাকি হাজারো সুবিধাবঞ্চিত শিশুর অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
bdit.com.bd