এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী
আজ ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব পর্যটন দিবস। বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম সম্ভাবনাময় এবং উদীয়মান খাত হলো- পর্যটন শিল্প। বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক বালুকাময় সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার, নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বান্দরবান এবং প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনকে কেন্দ্র করে এ দেশের পর্যটন খাত আবর্তিত হয়। কিন্তু ২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের পর থেকে এই শিল্প এক বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। রোহিঙ্গা সংকট কেবল একটি মানবিক বা ভূ-রাজনৈতিক সমস্যাই নয়, বরং এটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও পর্যটন খাতের টেকসই বিকাশের ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কক্সবাজার, কুয়াকাটা, সুন্দরবন, সিলেট এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়-অরণ্য প্রতি বছর লাখ লাখ দেশি-বিদেশি পর্যটককে আকর্ষণ করে। বিশেষ করে কক্সবাজারকে বাংলাদেশের পর্যটনের রাজধানী বলা চলে। এই অঞ্চলকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে শত শত হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট এবং নানা ধরনের স্থানীয় ব্যবসা, যা জাতীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের অবদান রাখছে।
বর্তমানে উখিয়া ও টেকসনাফের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী শিবির গড়ে উঠেছে, যেখানে ১৫ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বসবাস করছে। দীর্ঘ সময় পার হলেও এই সংকটের কোনো স্থায়ী কূটনৈতিক সমাধান না হওয়ায় এই বিশাল জনসংখ্যা স্থানীয় অর্থনীতি, পরিবেশ ও সার্বিক নিরাপত্তার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে। পর্যটনের অন্যতম প্রধান পূর্বশর্ত হলো নিরাপদ পরিবেশ। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে মাদক চোরাচালান (বিশেষ করে ইয়াবা ও আইস), অস্ত্র ব্যবসা, মানব পাচার, অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও অপহরণের মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এই অপরাধের প্রভাব ক্যাম্পের বাইরে স্থানীয় পর্যটন এলাকাগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই অবনতি দেশি-বিদেশি পর্যটকদের মনে এক ধরনের ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দিচ্ছে, যা পর্যটক আগমনের সংখ্যা কমিয়ে দিচ্ছে।
শরণার্থী শিবিরে কর্মরত শত শত আন্তর্জাতিক ও দেশীয় সংস্থার যাতায়াত এবং ত্রাণবাহী ভারী যানবাহন চলাচলের কারণে কক্সবাজার ও টেকনাফের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যানজটের তীব্রতা বাড়ার কারণে পর্যটকেরা সাধারণ যাতায়াতে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। এছাড়া উখিয়া ও টেকনাফের অনেক পর্যটন স্পট বা এর আশেপাশের এলাকাগুলোতে সাধারণ পর্যটকদের চলাচলে নানা রকম বিধিনিষেধ ও নজরদারি বলয় তৈরি হয়েছে, যা ভ্রমণের আনন্দকে ব্যাহত করে। রোহিঙ্গা সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে কক্সবাজার অঞ্চলটি একটি সংঘাতপূর্ণ ও মানবিক বিপর্যয়প্রবণ এলাকা হিসেবে বারবার চিত্রিত হচ্ছে। এর ফলে বিদেশি পর্যটকদের কাছে এই অঞ্চলের নেতিবাচক বার্তা যাচ্ছে। পশ্চিমা দেশগুলোর ট্রাভেল অ্যাডভাইজরি বা ভ্রমণ নির্দেশিকায় অনেক সময় এই অঞ্চলে ভ্রমণের ক্ষেত্রে সতর্কতা জারি করা হয়, যা বিদেশি পর্যটক আকর্ষণের ক্ষেত্রে বড় একটি বাধা।
একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা একে অপরের পরিপূরক। আন্তর্জাতিক মঞ্চে জ্বালাময়ী ভাষণ কিংবা কূটনৈতিক সংলাপের নিজস্ব মূল্য থাকলেও, সাহসী ও কার্যকর পদক্ষেপের অনুপস্থিতিতে তা কেবলই আনুষ্ঠানিকতায় রূপ নেয়। বাংলাদেশের সমসাময়িক ইতিহাসে এই সত্যটি দুটি ভিন্ন প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত প্রচ্ছন্ন হয়ে উঠেছে— প্রথমটি দীর্ঘস্থায়ী রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট এবং দ্বিতীয়টি স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (টঘএঅ) অধিবেশনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা বারবার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পক্ষে জোরালো বক্তব্য রেখেছেন। হিসাব অনুযায়ী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রেকর্ড ৭ বার, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূস ২ বার এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১ বারসহ মোট ৯ বার জাতিসংঘের মঞ্চে দাঁড়িয়ে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের দাবি তুলেছেন। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে কার্যকর কোনো প্রতিশ্রুতি বা মিয়ানমারের ওপর দৃশ্যমান চাপ তৈরি করা সম্ভব হয়নি। এই বাস্তবতা প্রমাণ করে যে, কেবল জাতিসংঘে ভাষণ দিয়ে কিংবা আরও ৯০ বার একই দাবির পুনরাবৃত্তি করেও রোহিঙ্গাদের তাদের মাতৃভূমিতে ফেরত পাঠানো যাবে না; এর জন্য প্রয়োজন সাহসী, দ্বিপাক্ষিক ও বহুমাত্রিক কার্যকর উদ্যোগ। ঠিক যেভাবে দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে কেবল সভা-সমাবেশ আর ভাষণের মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটানো সম্ভব হয়নি—তার জন্য প্রয়োজন হয়েছিল ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার এক অভূতপূর্ব ও রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থান।
বিগত এক দশকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের প্রতিটি অধিবেশনে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এই সংকটের স্থায়ী সমাধানের দাবি জানানো হয়েছে। শেখ হাসিনা তাঁর সময়ে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য প্রতি বছরই জাতিসংঘের মঞ্চকে ব্যবহার করেছেন। তিনি বিশ্বনেতাদের সামনে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি, কফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন এবং নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের তাগিদ দিয়েছেন। একইভাবে ২০২৪-২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে শান্তিতে নোবেলজয়ী ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূস জাতিসংঘের ৭৯তম অধিবেশনে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে নতুন আন্তর্জাতিক উদ্যোগের আহ্বান জানান।
তবে এই সমস্ত ভাষণের মূল সীমাবদ্ধতা ছিল এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহানুভূতি আদায় করতে পারলেও মিয়ানমার সরকারের ওপর কোনো বাধ্যবাধকতা তৈরি করতে পারেনি। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে চীন ও রাশিয়ার ভেটো ক্ষমতার কারণে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে কোনো কঠোর অর্থনৈতিক বা সামরিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা সম্ভব হয়নি। ফলে, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মঞ্চে দাঁড়িয়ে যতবারই আবেগঘন ভাষণ দেওয়া হোক না কেন, তা কেবল একটি বার্ষিক আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে “সফ্ট পাওয়ার” বা কূটনৈতিক ভাষা ততক্ষণ পর্যন্ত কাজ করে না, যতক্ষণ না তার পেছনে কোনো “হার্ড পাওয়ার” বা কৌশলগত চাপ থাকে। ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের কারণে ভারত ও চীনের মতো আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলো মিয়ানমারের জান্তা সরকারের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রেখেছে, যা বাংলাদেশের কূটনৈতিক দাবিগুলোকে আরও দুর্বল করে দিয়েছে।
কেন শুধু ভাষণে রোহিঙ্গা ফেরত যাবে না? রোহিঙ্গা সংকট কেবল একটি মানবিক বিপর্যয় নয়, এটি একটি জটিল ভূ-রাজনৈতিক খেলা। মিয়ানমার ঐতিহাসিকভাবেই রোহিঙ্গাদের তাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে। এমতাবস্থায় কেবল আন্তর্জাতিক মঞ্চে আবেদন-নিবেদন করে তাদের ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন এমন কিছু পদক্ষেপ যা মিয়ানমারকে বাধ্য করবে তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে। আরও ৯০ বার ভাষণ দিলেও পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হবে না যদি না বাংলাদেশ তার পররাষ্ট্রনীতিতে আমূল পরিবর্তন আনে।
কার্যকর উদ্যোগের অভাবের কারণে গত ৯ বছরে একজন রোহিঙ্গাকেও আনুষ্ঠানিকভাবে ফেরত পাঠানো যায়নি। দ্বিপাক্ষিক চুক্তির নামে যে সমস্ত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা ছিল ত্রুটিপূর্ণ এবং মিয়ানমারের কালক্ষেপণের কৌশল মাত্র। মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (ওঈঈ) পুরোপুরি জবাবদিহিতার আওতায় আনা, দেশটির ওপর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জোরদার করা এবং আরাকান আর্মি ও অন্যান্য বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সাথে রাখাইন রাজ্যের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে নতুন সমীকরণ তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। শুধু ভাষণের ওপর নির্ভর করে হাত গুটিয়ে বসে থাকার নীতি বাংলাদেশকে এক দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক, সামাজিক ও নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলেছে।
ভাষণের রাজনীতির শিক্ষা: রোহিঙ্গা সংকটের এই আন্তর্জাতিক ব্যর্থতার সাথে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি গভীর মিল রয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একটি ফ্যাসিবাদী ও কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা কায়েম ছিল। এই দীর্ঘ সময়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো হাজার হাজার সভা, সেমিনার, সংবাদ সম্মেলন এবং আন্তর্জাতিক মহলে লবিংয়ের মাধ্যমে সরকারের স্বৈরাচারী আচরণের বিরুদ্ধে কথা বলেছে। দিনের পর দিন জ্বালাময়ী রাজনৈতিক ভাষণ দেওয়া হয়েছে, লিফলেট বিতরণ করা হয়েছে এবং গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, কেবল ভাষণ এবং নিয়মতান্ত্রিক শান্তিপূর্ণ আন্দোলন এই সুসংগঠিত স্বৈরাচারী ব্যবস্থার পতন ঘটাতে পারেনি। ফ্যাসিবাদী সরকার রাষ্ট্রযন্ত্রকে—বিশেষ করে পুলিশ, র্যাব, প্রশাসন এবং বিচার বিভাগকে—নিজেদের দলীয় স্বার্থে এমনভাবে ব্যবহার করেছিল যে, সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং নির্বাচনী ব্যবস্থা ধ্বংসের মাধ্যমে তারা ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার বন্দোবস্ত করেছিল। এই পরিস্থিতিতে কেবল মঞ্চের ভাষণ কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি, বরং স্বৈরাচারকে আরও বেশি সময় ও সুযোগ করে দিয়েছিল।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান যেভাবে একটি অসম্ভবকে সম্ভব করেছে, ঠিক একইভাবে রোহিঙ্গা সংকটের মতো আন্তর্জাতিক জটিলতার সমাধানেও বাংলাদেশকে প্রথাগত কূটনৈতিক ভাষণের বাইরে এসে সাহসী উদ্যোগ নিতে হবে। জাতিসংঘের মঞ্চে দেওয়া ৯টি ভাষণ আমাদের যে শিক্ষা দেয় তা হলো—বিশ্বের পরাশক্তিগুলো তাদের নিজস্ব স্বার্থ ছাড়া নড়াচড়া করে না। তাই বাংলাদেশকে এখন বহুমাত্রিক কৌশল অবলম্বন করতে হবে। মিয়ানমারের ভেতরের বর্তমান গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে রাখাইনের মূল অংশীজনদের সাথে কার্যকর আলোচনা শুরু করা, আন্তর্জাতিক চাপকে আরও দৃশ্যমান ও জোরালো করা এবং দেশের ভেতর জাতীয় ঐক্য বজায় রেখে একটি শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করা অত্যন্ত জরুরি। ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদ দূর করতে যেমন মাঠপর্যায়ের চূড়ান্ত লড়াইয়ের প্রয়োজন হয়েছিল, ঠিক তেমনি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতেও আন্তর্জাতিক কূটনীতির পাশাপাশি বাস্তবসম্মত ও শক্ত প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপের কোনো বিকল্প নেই।
লেখক: মহাসচিব রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম জাতীয কমিটি। চেয়ারম্যান: পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদ, উখিয়া।