আয়াত উল্ল্যাহ, ঢাকা:
দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলেন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্টরা। সঠিক রোগ নির্ণয়, ওষুধ ব্যবস্থাপনা এবং চিকিৎসাসেবার সামগ্রিক তদারকিতে তাদের ভূমিকা অপরিসীম। দীর্ঘদিন ধরে চলা পেশাগত বৈষম্য দূর করতে এবং নিজেদের ন্যায্য অধিকার আদায়ে এবার রাজপথে ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন তারা।
এরই ধারাবাহিকতায় মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্টদের অধিকার আদায়ের লড়াইকে আরও বেগবান করতে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করেছে নতুন সংগঠন “মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্ট অ্যাসোসিয়েশন (এমটিপিএ)”।
সংগঠনটির আত্মপ্রকাশ উপলক্ষে “মেডিকেল টেকনোলজিস্ট জাতির অধিকার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে” একটি বিশেষ আলোচনা সভা ও সেমিনারের আয়োজন করা হয়। উক্ত সভায় সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও পেশাজীবী প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। ‘আমাদের ঐক্যই আমাদের শক্তি! — দাবি মোদের একটাই, ১০ম গ্রেডের বাস্তবায়ন চাই!’— এই স্লোগানকে সামনে রেখে ১০ম গ্রেড অর্জন এবং বৈষম্যহীন পেশাগত মর্যাদার পাঁচ দফা লক্ষ্য নিয়ে আন্দোলনের ডাক দেন বক্তারা।
অধিকার আদায়ে ৫ দফা মূল দাবি
সেমিনারে মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের দীর্ঘদিনের বৈষম্য দূরীকরণে ৫টি যৌক্তিক ও সুনির্দিষ্ট দাবি তুলে ধরা হয়েছে:
1. ১০ম গ্রেড বাস্তবায়ন: ডিপ্লোমা প্রকৌশলী ও নার্সদের মতোই ডিপ্লোমা মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের প্রবেশ পদে ১০ম গ্রেড (২য় শ্রেণীর গেজেটেড পদমর্যাদা) প্রদান করতে হবে।
2. স্বতন্ত্র কাউন্সিল গঠন: শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণ, নিবন্ধন ও পেশাগত সুরক্ষার জন্য একটি ‘স্বতন্ত্র মেডিকেল টেকনোলজিস্ট কাউন্সিল’ গঠন করতে হবে।
3. প্রাইভেট প্র্যাকটিস নীতিমালা: সরকারি ও বেসরকারি সকল টেকনোলজিস্টদের নিরাপত্তা এবং মানসম্পন্ন সেবা নিশ্চিত করতে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
4. পদ সৃষ্টি ও নিয়োগ: বর্তমানে বিদ্যমান সকল শূন্য পদে দ্রুত নিয়োগ প্রদান এবং জনসংখ্যার অনুপাত অনুযায়ী নতুন পদ সৃষ্টি করতে হবে।
5. বৈদেশিক কর্মসংস্থান: আন্তর্জাতিক মানের দক্ষ টেকনোলজিস্ট তৈরি এবং সরকারি উদ্যোগে বিদেশে তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।
কেন ১০ম গ্রেড জরুরি? ৫টি যৌক্তিক কারণ
আন্দোলনকারীরা তাদের ১০ম গ্রেডের দাবির পক্ষে অত্যন্ত শক্তিশালী ও বিজ্ঞানসম্মত কারণসমূহ উপস্থাপন করেছেন:
বৈষম্য দূরীকরণ: সমমানের অন্যান্য ডিপ্লোমাধারীরা ১০ম গ্রেড পেলেও মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা দীর্ঘদিন ধরে এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত, যা একটি সুস্পষ্ট বৈষম্য।
কাজের চরম ঝুঁকি: প্রতিদিন জীবনঝুঁকি নিয়ে রেডিয়েশন, তেজস্ক্রিয়তা ও সংক্রামক জীবাণুর মতো অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিবেশে তাদের কাজ করতে হয়।
রোগ নির্ণয়ের প্রাণকেন্দ্র: সঠিক ল্যাব ও ইমেজিং রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই মূল চিকিৎসা প্রদান করা হয়। ভুল রিপোর্টের কারণে রোগীর জীবনহানি পর্যন্ত হতে পারে, তাই এই পদের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুতর।
কঠোর শিক্ষাগত মান: দীর্ঘ ৩ থেকে ৪ বছরের কঠিন একাডেমিক শিক্ষা এবং বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপের মাধ্যমে এই পেশাগত দক্ষতা অর্জন করতে হয়।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও বৈশ্বিক মান অনুযায়ী হেলথ টেকনোলজিস্টদের সম্মানজনক মর্যাদা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
১০ম গ্রেড বাস্তবায়ন বনাম অবাস্তবায়ন: দেশের স্বাস্থ্য খাতের লাভ-ক্ষতি
১০ম গ্রেড বাস্তবায়ন করা হলে দেশের স্বাস্থ্য খাতে আমূল পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বাস্তবায়নের সুবিধা এবং না হওয়ার অসুবিধাগুলো নিচে তুলনামূলক ছকে তুলে ধরা হলো:
বিষয় ১০ম গ্রেড বাস্তবায়ন হলে (সুবিধা) ১০ম গ্রেড বাস্তবায়ন না হলে (অসুবিধা)
পেশাগত মর্যাদা যোগ্য মর্যাদার স্বীকৃতি মিলবে ও বৈষম্য দূর হবে। সামাজিক ও দাপ্তরিক হীনমন্যতা বহাল থাকবে। মেধা আকর্ষণ স্বাস্থ্যখাতে দক্ষ ও মেধাবী তরুণরা উৎসাহিত হবে। মেধাবীরা বিমুখ হবে, শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সেবার মান কর্মস্পৃহা বৃদ্ধি পেয়ে সেবার মান উন্নত হবে। মানসিক ক্ষোভ ও হতাশায় সেবার মান ব্যাহত হবে। ক্যারিয়ার সুযোগ উচ্চশিক্ষা ও পদোন্নতির পথ উন্মুক্ত হবে। দীর্ঘদিন একই পদে স্থবির হয়ে থাকতে হবে।
ইতিবাচক ভবিষ্যৎ ভাবনা
নবগঠিত‘মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্ট অ্যাসোসিয়েশন (এমটিপিএ)’-এর মাধ্যমে এই আন্দোলন এখন আরও সুসংগঠিত। বক্তারা বলেন, মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের এই আন্দোলন কেবল নিজেদের অধিকার আদায়ের নয়, বরং দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মানোন্নয়নের একটি ইতিবাচক প্রয়াস। দেশের সাধারণ মানুষের সঠিক ও উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে এবং স্বাস্থ্য খাতকে আরও আধুনিক ও বৈষম্যহীন করতে মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের এই ন্যায্য দাবিগুলো দ্রুত পূরণ হওয়া সময়ের দাবি।