লেখক: সাবিত রিজওয়ান
প্রায় দুই শতাধিক কবি-লেখক একসময় অনলাইনে সাহিত্য মন্ত্রণালয়ের দাবি তুলেছিলেন। ঠিক কতজন ছিলেন জানি না, তবে ফেসবুকের একটি পোস্টে বড় একটি তালিকা চোখে পড়েছিল। আমিও সেই দাবির সঙ্গে ছিলাম। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে একটা বিষয় স্পষ্ট হয়েছে—আমরা দাবি করেছি, কিন্তু গুরুত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করিনি কেন এই মন্ত্রণালয় প্রয়োজন, কীভাবে এটি কাজ করবে, আর এতে সমাজ বা রাষ্ট্র কীভাবে উপকৃত হবে। ফলে এই দাবি জনগণের কাছেও গুরুত্ব পায়নি, সরকারের কাছেও নয়।
আমি কোটা ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকে সমর্থন করেছি, স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লিখেছি। সেই আন্দোলনের ফলেও সরকার পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু দেশ কাঙ্ক্ষিতভাবে বদলেছে কি না, সে প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত। পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু সমৃদ্ধি হয়নি প্রত্যাশামতো। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আমি তখন পায়রাভরত একাডেমির (সময়ের ভাবনা) মেসেঞ্জার গ্রুপে বলেছিলাম—নতুন সরকার গঠনের আগের এই শূন্য সময়টাই সাহিত্য মন্ত্রণালয়ের দাবি তোলার উপযুক্ত মুহূর্ত। কয়েকজন বলেছিলেন, “হ্যাঁ, ঠিক।” কিন্তু সেটাও ছিল আনুষ্ঠানিক সম্মতি, দায়বদ্ধ উদ্যোগ নয়।
আমরা এমন এক দেশে বাস করি, যেখানে প্রতিষ্ঠান গঠনের অভাব নেই। কিছু প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ, কিছু আবার কেবল নামসর্বস্ব। একটা ট্রেন যদি প্রতিটি স্টেশনে থামে, যাত্রী ওঠানামা করায়, তখন তাকে আমরা লোকাল ট্রেন বলি। আমাদের রাজনীতিও অনেকটা তেমন হয়ে গেছে—প্রতিটি মোড়ে সভাপতি, সেক্রেটারি, নেতা-পাটি নেতার অভাব নেই। কিন্তু নেতৃত্ব আছে, দিশা নেই।
সংস্কৃতির ভেতরেই সাহিত্য পড়ে। এই যুক্তিতে কেউ বলেন, আলাদা সাহিত্য মন্ত্রণালয়ের দরকার নেই। কথাটা পুরোপুরি ভুলও নয়। সমস্যা মন্ত্রণালয়ের সংখ্যায় নয়, সমস্যা মানসিকতায়। আমরা দেখেছি, যাঁরা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান, তাঁদের অনেকের মাঝেই সাহিত্যের প্রতি তেমন দরদ নেই। ফলে সাহিত্য রাষ্ট্রীয় নীতিতে থাকে নামমাত্র, বাস্তবে থাকে অবহেলিত।
তাহলে প্রশ্ন আসে—নতুন মন্ত্রণালয় করলে কি সমস্যার সমাধান হবে? সম্ভবত না, যদি না সেই মন্ত্রণালয় পরিচালনা করেন আদর্শবান, সাহিত্যবোদ্ধা ও দায়বদ্ধ মানুষ। আবার মন্ত্রণালয় না করলেও চলত, যদি বিদ্যমান কাঠামোর ভেতরেই সাহিত্যকে গুরুত্ব দেওয়া হতো। কিন্তু সেটাও হচ্ছে না।
আসলে আমাদের দেশের মূল সংকট প্রতিষ্ঠান সংকট নয়, মানুষ সংকট। আদর্শবান মানুষের অভাব, দক্ষতার অভাব, পারস্পরিক বিশ্বাসের অভাব। আমরা যদি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে পারতাম, দল-মত নির্বিশেষে রাষ্ট্রকে নিজের বলে ভাবতে পারতাম, তাহলে এত দপ্তর, এত মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজনই পড়ত না। তখন রাষ্ট্র ভিক্ষার হাত বাড়াত না, নাগরিক আত্মসম্মানের সঙ্গে দাঁড়াতে পারত।
সাহিত্য মন্ত্রণালয়ের দাবি তাই আজ আমার কাছে আর কেবল একটি প্রশাসনিক প্রশ্ন নয়। এটা আসলে আমাদের রাষ্ট্রচিন্তার দৈন্যের প্রতিফলন। আমরা কাঠামো চাই, কিন্তু মূল্যবোধ চাই না। নাম চাই, কিন্তু দায় চাই না। অথচ সাহিত্য তো মূলত মানুষের ভেতরটা গড়ার কাজ করে। সেই মানুষটাই যদি রাষ্ট্রে অনুপস্থিত থাকে, তবে মন্ত্রণালয় থাকুক বা না থাকুক, সাহিত্যের অবস্থান বদলাবে না।
তাই প্রশ্নটা আজ এই নয়—সাহিত্য মন্ত্রণালয় হবে কি হবে না। প্রশ্নটা হলো—আমরা কি এমন মানুষ তৈরি করতে পারছি, যারা সাহিত্যকে রাষ্ট্রের অলংকার নয়, রাষ্ট্রের বিবেক হিসেবে দেখতে পারবে? যদি সেই মানুষ না আসে, তাহলে নতুন মন্ত্রণালয়ও শেষ পর্যন্ত আরেকটি লোকাল ট্রেন হয়েই থেকে যাবে।