এড. জসিম উদ্দিন
ক্ষুধার্ত দুই শিশুসহ ফুটপাতে পুরো পরিবারের ঘুমিয়ে পড়ার দৃশ্যটি মানবতাবোধে চরম আঘাত হানে। এটি কেবল একটি ব্যক্তিগত সংকট নয়, বরং রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব, মানবাধিকার, আইনি সুরক্ষা এবং নৈতিক কাঠামোর ব্যর্থতার প্রতীক।
১. মানবতা ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব-কর্তব্য রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হলো তার নাগরিকদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসা সহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব।
ফুটপাতে শিশুদের রাত কাটানো রাষ্ট্রের এই দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি নির্দেশ করে।
২. দেশের আইন ও আন্তর্জাতিক আইন, জাতীয় আইন: সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে প্রত্যেক নাগরিকের আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার এবং জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতার অধিকারের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে।আন্তর্জাতিক আইন:
জাতিসংঘ ঘোষিত মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র (UDHR) এবং শিশু অধিকার সনদের (CRC) স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের প্রতিটি শিশুর খাদ্য, বাসস্থান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আইনি ও নৈতিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
৩. ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ ও জীবন প্রণালী ইসলাম সহ প্রায় সব ধর্মেই খাদ্যাভাব ও গৃহহীনদের সাহায্য করাকে সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি পেটপুরে খায় আর তার প্রতিবেশী না খেয়ে থাকে, সে প্রকৃত মুমিন নয়।” রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত জীবন প্রণালীতে আর্তমানবতার সেবা এবং দানশীলতাকে মুক্তির উপায় হিসেবে দেখানো হয়েছে।
৪. অসহায়ত্ব, ক্ষুধা ও যন্ত্রণার জীবন প্রণালী ফুটপাতের জীবন এক নির্মম বাস্তবতা।
এখানে ক্ষুধার যন্ত্রণা, শীত-বৃষ্টির কষ্ট এবং সামাজিক সুরক্ষার অভাব মানুষকে প্রতিনিয়ত মৃত্যুর মুখোমুখি করে।
একটি শিশু যখন ন্যূনতম খাদ্য ও আশ্রয়ের অভাবে খোলা আকাশের নিচে ঘুমায়, তখন তার শারীরিক ও মানসিক বিকাশ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
প্রতিকার ও উত্তরণের উপায় এই চরম মানবিক বিপর্যয় রোধে রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি:সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী: বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা ও দরিদ্র পরিবারের জন্য ভিজিএফ (VGF) এবং ওএমএস (OMS) কার্ডের আওতা বাড়িয়ে সঠিক বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে।
বিনামূল্যে আবাসন:
গৃহহীনদের জন্য সরকারের স্থায়ী পুনর্বাসন প্রকল্প (যেমন: আশ্রয়ণ প্রকল্প) ও লঙ্গরখানা বা ভ্রাম্যমাণ রান্নাঘরের (Community Kitchen) সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।
জরুরি সহায়তা: যে কোনো গৃহহীন পরিবার যেন হটলাইন নম্বরের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক খাদ্য ও আশ্রয় সহায়তা পায়, সেই ব্যবস্থা করা।
বেসরকারি উদ্যোগ:
সামাজিক সংগঠন ও বিত্তশালীদের এগিয়ে আসতে হবে। জরুরি সহায়তার জন্য সমাজসেবা অধিদপ্তর বা জেলা প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করা যেতে পারে।
কর্মসংস্থান সৃষ্টি:
সক্ষম ব্যক্তিদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও কর্মমুখী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, যাতে তারা নিজেরাই নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারে।
পরিশেষে, রাষ্ট্র, সমাজ ও ধর্ম—এই তিনের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি কল্যাণমূলক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব, যেখানে ফুটপাতে কোনো শিশু বা পরিবারকে ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুমাতে হবে না।
রাষ্ট্র, সমাজ ও বিত্তবানদের কাছে দেশের প্রতিটি মানুষের এই প্রত্যাশাই রইলো।
মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন।
অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।