তৃষা জোয়াদ্দার
শিল্পচর্চা আমার কাছে শুধু কাগজে রং ও রেখার সমন্বয় নয়; এটি নিজের ভাবনা, অনুভূতি, কল্পনা ও চারপাশের জীবনকে প্রকাশ করার একটি শক্তিশালী মাধ্যম। ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকা, রং, রেখা ও বিভিন্ন সৃজনশীল কাজের প্রতি আমার আগ্রহ রয়েছে। সময়ের সঙ্গে সেই আগ্রহই আমার স্বপ্নে পরিণত হয়েছে। আমি শিল্পচর্চার মাধ্যমে ভালো কিছু করতে চাই এবং নিজের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলতে চাই।আমি মনে করি, একজন শিল্পী শুধু চোখ দিয়ে দেখেন না, হৃদয় দিয়ে অনুভবও করেন। মানুষের সুখ-দুঃখ, প্রকৃতির সৌন্দর্য, শ্রমজীবী মানুষের জীবন, সমাজের পরিবর্তন কিংবা চারপাশের ছোট ছোট ঘটনাও একজন শিল্পীর সৃষ্টির বিষয় হতে পারে। একটি শিল্পকর্ম কখনো আনন্দ দেয়, কখনো প্রশ্ন তৈরি করে, আবার কখনো মানুষের জীবনের কোনো অজানা গল্প সবার সামনে তুলে ধরে। তাই শিল্প শুধু সৌন্দর্য প্রকাশের মাধ্যম নয়; মানুষের জীবন ও সমাজকে বোঝারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষা।বাংলার শিল্পজগতে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন আমার অন্যতম প্রধান অনুপ্রেরণা। তাঁর শিল্পে মানুষের জীবন ও সময়ের বাস্তবতা বিশেষভাবে প্রকাশ পেয়েছে। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের চিত্রমালায় ক্ষুধার্ত ও অসহায় মানুষের যে বাস্তবচিত্র তিনি তুলে ধরেছিলেন, তা শিল্পের মানবিক শক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। অন্যদিকে, এস এম সুলতানের শিল্প আমাকে বাংলার কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ ও গ্রামীণ জীবনের শক্তি ও সৌন্দর্যকে নতুনভাবে দেখতে শেখায়। তাঁর শিল্পে মাটি ও মানুষের সঙ্গে গভীর সম্পর্কের প্রকাশ খুঁজে পাই।খুলনা আর্ট একাডেমি পরিচালিত চারুকলা ভর্তি কোচিংয়ের ১৭তম ব্যাচে ভর্তি হয়ে চিত্রশিল্পী মিলন বিশ্বাস স্যারের কাছ থেকে বাংলাদেশের স্বনামধন্য এই দুই শিল্পীর জীবন ও শিল্পকর্ম সম্পর্কে জেনে অনুপ্রেরণা নিতে চাই, কিন্তু তাঁদের অনুকরণ করতে চাই না। কারণ একজন শিল্পীর নিজস্ব পরিচয় গড়ে ওঠে তাঁর নিজস্ব চিন্তা, অভিজ্ঞতা ও দেখার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। আমি চাই, আমার শিল্পে আমার নিজের দেখা পৃথিবী, অনুভূতি এবং চারপাশের মানুষের গল্প ফুটে উঠুক।একজন ভালো শিল্পী হয়ে ওঠার জন্য শুধু প্রতিভা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নিয়মিত অনুশীলন, ধৈর্য, পরিশ্রম, পর্যবেক্ষণ এবং শেখার আগ্রহ। ভুলকে ভয় না পেয়ে প্রতিদিন নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করতে হবে। একই সঙ্গে একজন শিল্পীর মধ্যে মানবিকতাও থাকা জরুরি। মানুষের জীবন ও অনুভূতিকে বুঝতে পারলে শিল্পের প্রকাশ আরও গভীর ও অর্থবহ হয়।বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে পড়াশোনার প্রস্তুতির জন্য আমি খুলনা আর্ট একাডেমির ১৭তম ব্যাচের চারুকলা ভর্তি কোচিংয়ে ভর্তি হয়েছি। এখানে চিত্রশিল্পী মিলন বিশ্বাস স্যার আমাদের শিল্পশিক্ষার পাশাপাশি নৈতিকতা, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধের বিষয়েও গুরুত্ব দেন। একজন ভালো মানুষ হতে হলে কী কী গুণ থাকা প্রয়োজন, কীভাবে মানুষের পাশে দাঁড়াতে হয় এবং সমাজের প্রতি আমাদের কী দায়িত্ব রয়েছে এসব বিষয় নিয়েও তিনি আমাদের ভাবতে শেখান।স্যারের কাছ থেকে পাওয়া এই শিক্ষা আমার শিল্পচর্চাকে শুধু দক্ষতা অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে একজন সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে অনুপ্রাণিত করছে। এ জন্য আমি তাঁর প্রতি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ।আমার স্বপ্ন শুধু নিজের জন্য শিল্পচর্চা করা নয়; শিল্পের মাধ্যমে মানুষের জীবন, প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও আমাদের দেশের গল্পকে তুলে ধরা। আমি বিশ্বাস করি, নিয়মিত চর্চা, পরিশ্রম ও শেখার মানসিকতা থাকলে একজন মানুষ ধীরে ধীরে নিজের স্বপ্নের পথে এগিয়ে যেতে পারে। ভবিষ্যতে আমার শিল্প যদি মানুষের মনে আনন্দ, অনুভূতি কিংবা নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করতে পারে, সেটিই হবে আমার সবচেয়ে বড় অর্জন।
তৃষা জোয়াদ্দার
শিক্ষার্থী, ১৭তম ব্যাচ
খুলনা আর্ট একাডেমি
চারুকলা ভর্তি কোচিং