• শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬, ০৫:০৩ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]
Headline
এসপি বেলাল হোসেনের দ্রুত আরোগ্য কামনায় রাণীশংকৈল থানা পুলিশের দোয়া মাহফিল শান্ত খুলনা নগরী এখন অশান্ত, মাদক ও আধিপত্যের দ্বন্দ্বে বাড়ছে হত্যাকাণ্ড ‘ইস্পাহানি মির্জাপুর বাংলাবিদ’ এর রংপুর বিভাগের সেরা নির্বাচিত, ঢাকায় যাচ্ছে বিভাগীয় চ্যাম্পিয়ন In Memoriam Kazi Mohammed Sherif Saheb আটপাড়ায় জেলা প্রশাসকের দিনব্যাপী পরিদর্শন ও জনকল্যাণমূলক সহায়তা প্রদান পুরান ঢাকার লেখিকা মারিয়াম রামলা ভারতের জনপ্রিয় ম্যাগাজিনে স্থান পেলেন কবিতাঃ স্বপ্ন মেদিনীর খোঁজে ​দল পুনর্গঠনে বড় পদক্ষেপ: বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব পদে অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী তাড়াশে তালম ইউনিয়ন পরিষদ পরিদর্শনে জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম তুরাগ তীরে জিমপির সাঁড়াশি অভিযান: মাদক বিক্রেতাসহ আটক ২৯ ​

শান্ত খুলনা নগরী এখন অশান্ত, মাদক ও আধিপত্যের দ্বন্দ্বে বাড়ছে হত্যাকাণ্ড

Reporter Name / ৭ Time View
Update : শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬

মো: আল-মাহফুজ শাওন, খুলনা:

এক সময়ের শান্ত শহর খুলনা এখন ক্রমেই অশান্ত হয়ে উঠছে। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে বাড়ছে আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা। চলতি বছরের শুরু থেকে ১৯ আগস্ট পর্যন্ত খুলনা মহানগরীতে ২২টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। পুলিশের একটি সূত্রের দাবি, এসব হত্যাকাণ্ডের প্রায় ৯৫ শতাংশই মাদককে কেন্দ্র করে সংঘটিত হয়েছে। বাকি ৫ শতাংশের পেছনে রয়েছে অন্যান্য কারণ।

আইনশৃঙ্খলা সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণ, আধিপত্য বিস্তার এবং স্বার্থগত দ্বন্দ্বই সাম্প্রতিক অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডের অন্যতম কারণ। ক্ষমতার পালাবদলের পর নগরীর বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় মাদক সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে বিরোধ তৈরি হয়েছে। আর সেই বিরোধ অনেক ক্ষেত্রে সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডে রূপ নিচ্ছে।

একাধিক গোয়েন্দা সূত্রের ভাষ্য, বিগত সরকারের সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তির মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় মাদক ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ ছিল। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে বিরোধ বেড়েছে। ফলে মাদককেন্দ্রিক অপরাধের পাশাপাশি আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘাতও বাড়ছে। তবে অতীতের রাজনৈতিক প্রভাব ও মাদক ব্যবসার যোগসূত্রের এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি সংস্থার দাবি, বর্তমান পরিস্থিতিতে নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা শুধু পুলিশের একার পক্ষে কঠিন। অপরাধ দমনে পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা, প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এবং নাগরিক সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

অন্যদিকে একাধিক সূত্রের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় গোয়েন্দা নজরদারি কমে যাওয়া, থানা-কেন্দ্রিক দাপ্তরিক কাজের বাইরে মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনে কঠোরতার ঘাটতি এবং অপরাধীদের সঙ্গে কিছু অসাধু পুলিশ সদস্যের যোগসাজশের অভিযোগের কারণে অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে। তবে এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

খুলনা জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, ৫ আগস্টের পর থেকে আমাদের অধীনস্থ কর্মকর্তা যারা আছেন, তারা প্রফেশনালি কাজ করছে না। তাদের ভেতরে এক ধরনের দ্বিধা কাজ করছে। আগে যে উদ্যম নিয়ে কাজ করত, সেটা তাদের ভেতর নেই। ৫ আগস্টের পর পুলিশ যে ধাক্কা খেয়েছে, সেটা এখনো সামলাতে পারেনি তারা।

তিনি বলেন, আইনের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা থাকা উচিত। সেটা মানুষের মধ্য থেকে উঠে গেছে। মানুষ যদি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়, তাহলে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার উন্নতি হবে।

শুধু পুলিশকে দায়ী না করে সামাজিক দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে পুলিশ সুপার বলেন, সমাজব্যবস্থার উন্নতির দায়িত্ব সবার। মাদকবিরোধী কার্যক্রম জোরদারে সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের এগিয়ে আসতে হবে।

তিনি আরও জানান, সম্প্রতি চরমপন্থিরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। তাদের বিরুদ্ধেও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কেএমপির ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (সদর) এমএম শাকিলুজ্জামান বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে পুলিশ ব্যর্থ—এমনটা বলা যাবে না। পরিসংখ্যান দেখলেই পুলিশের কার্যক্রমের চিত্র পাওয়া যাবে। অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার হচ্ছে, আসামিদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, হরিণটানা এলাকার দুটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সন্দেহের তালিকায় সাইফির নাম এসেছে। এর আগেও পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করেছিল। তবে সম্প্রতি তিনি হাইকোর্ট থেকে জামিনে বের হয়েছেন। আমরা কাউকে দোষারোপ করছি না, আমরা আমাদের কাজ করে যাচ্ছি, বলেন তিনি।

শহরে হত্যাকাণ্ড বাড়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে শাকিলুজ্জামান বলেন, স্বার্থগত দ্বন্দ্ব ও মাদকের কারণে হত্যাকাণ্ড ঘটছে। অপরাধপ্রবণতা কমাতে মানুষের কাউন্সেলিংয়ের জন্য উঠান বৈঠকসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, অপরাধ দমনে তথ্য দিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহযোগিতা করতে হবে।

নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব বাবুল হাওলাদার বলেন, খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেকোনো সময়ের রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। পুলিশ প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন শাখা ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, প্রশাসনের আন্তরিকতার ঘাটতি রয়েছে, নাকি পেশাদারিত্বের ঘাটতি, প্রশিক্ষণের ঘাটতি—নাকি অন্য কোনো সমস্যা রয়েছে, তা পরিষ্কার নয়।

ঘর থেকে মসজিদ পর্যন্ত কোথাও নিরাপদ নেই। যখন তখন খুনের ঘটনা ঘটছে, বলেন তিনি।

মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা গেলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব বলেও মনে করেন তিনি।

খুলনা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মোঃ তরিকুল ইসলাম বলেন, খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়েছে। অন্তঃকোন্দলের কারণে একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটছে এবং এর অন্যতম উৎস মাদক।

তিনি বলেন, মাদক সিন্ডিকেটগুলো একে অপরকে ঘায়েল করে এলাকায় আধিপত্য বিস্তারে ব্যস্ত। সমাজকে মাদকমুক্ত করতে পারলে অপরাধপ্রবণতা অনেকটাই কমে আসবে। তবে এজন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ এবং বিশেষ করে রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

ঘরে ঘরে হত্যাকাণ্ড দেখতে না চাইলে সবাইকে মাঠে নামতে হবে, মন্তব্য করে তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও কঠোর হওয়ার আহ্বান জানান।

খুলনা সিটি কর্পোরেশনের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর শমসের আলী মিন্টু বলেন, নগরবাসী বর্তমানে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। প্রশাসনের প্রধান দায়িত্ব মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

তিনি বলেন, মাদকের আধিপত্যকে কেন্দ্র করে যেসব হত্যাকাণ্ড ঘটছে, সেগুলোর দায় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এড়াতে পারে না।

খুলনা সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, নগরীর বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় সন্ত্রাসবিরোধী সভা করা হচ্ছে। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় নগরবাসী উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে বুধবারের দুটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় বিভিন্ন ওয়ার্ড ও সন্ত্রাসপ্রবণ এলাকায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রশাসনকে বলা হয়েছে।

সন্ত্রাস দমনে সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে বলেও জানান তিনি।

নগরীর সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ড ও অপরাধপ্রবণতার চিত্র বিশ্লেষণ করলে মাদক, আধিপত্য বিস্তার, স্বার্থগত দ্বন্দ্ব এবং অপরাধী চক্রের সক্রিয়তার বিষয়গুলো সামনে আসছে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা ও মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু অভিযান পরিচালনা করে দীর্ঘমেয়াদে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। মাদকের উৎস বন্ধ করা, মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, অপরাধীদের রাজনৈতিক বা সামাজিক আশ্রয় বন্ধ, গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি নাগরিক সমাজকে সম্পৃক্ত করতে হবে।

নগরবাসীর প্রত্যাশা—দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে খুলনাকে আবারও নিরাপদ নগরী হিসেবে ফিরিয়ে আনা হবে। কারণ ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড শুধু কয়েকটি পরিবারের স্বপ্নই ভেঙে দিচ্ছে না, পুরো নগরবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাপন ও নিরাপত্তাবোধকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
bdit.com.bd