লাজে রাঙা অন্তরীক্ষ
সিঁদুর ললাটে রওনা হয়,
গোধূলির পালকি চড়ে
নীলাঞ্জনের আঁচল ছেড়ে,
সোনালি অরুণের হাসি আনন্দ ছিন্ন করে
পাড়ি জমায় আধার পথে।
বেদনামূর্ত রক্তিম রবি
কষ্ট বুকে চেপে বিদায় নিল পশ্চিমায়,
মিলিয়ে গেল শূন্যের গর্ভে
রইল না কোনো অস্তিত্ব।
সারাবেলা সোনা ছড়িয়ে
চেহারা আজ ফ্যাকাশে, দেহ নিস্তেজ,
পদার্পণ করেছে জীবনের গোধূলি লগ্নে।
পেছনে ফিরে তাকিয়ে অবচেতনে হিসেব করে
পশ্চিম গগনে ধীরে ধীরে
ঢলে পড়ে মৃত্যুর কোলে।
দিগন্ত আধারের হাতে হাত রেখে
পা বাড়ালো নবীন জীবনের প্রান্তে,
বাধা পড়ল এক নব অধ্যায়ে।
পাখির কলরব ইতি হল
খড়কুটোর সংসারে,
নিসঙ্গতার সঙ্গী পথঘাট
ঘুম ঘুম চোখে ঢুলতে থাকে।
নগরীর প্রাণচাঞ্চল্য হারিয়ে গিয়ে
নিরজনতার অজানা স্রোতে,
হই-হুল্লোড় আর চিত্তের আকুলতা
ঠাঁই নিল প্রাণহীন নির্জীবতায়।
হারানো সকালের স্নিগ্ধতা,
বিকেলের প্রফুল্ল প্রহরের স্মৃতি
আজও হাতছানি দিয়ে ডাকে।
ব্যস্ততার ভিড়ে ক্লান্ত মন আজও খোঁজে
অতীতের স্মৃতিকথা
যেখানে ছিল স্নেহ, মমতা আর ভালোবাসার পরশ,
সব তুচ্ছ করে যান্ত্রিক বরজে ঢেকে দিল সময়।
নিসঙ্গতার তিক্ততায় কাতর মন
আকুল হয়ে বারবার ফিরতে চায়
অতীতের সেই ছোট কোণে,
মায়া-মমতায় মোড়ানো চাদরে
যেখানে ছিল না কোনো ক্রন্দন বা বেদনার ছাপ,
ছিল শুধু আনন্দঘন দুশ্চিন্তামুক্ত প্রাণোচ্ছ্বলতা।
সারাদিনের বিশৃঙ্খলতায়
তন্দ্রার ঘোরে ক্লান্ত পথ
অবশেষে খুঁজে পেল নিঝুমতা
যেখানে নেই কোনো বিরক্তির ছায়া,
কোনো হুল্লোড়।
যেখানে শুধু বাতাসের মিষ্টি বাঁশি,
পাতার মরমর যেন কেউ নিঃশব্দে নূপুর বাজাচ্ছে
এ নিদ্রা ভেঙে দেওয়ার কোনো উপক্রম নেই কোথাও।
এই নিঝুম প্রহরে নেই কোনো ডাকাডাকি,
নেই কোনো সাড়া,
কোনো দুশ্চিন্তার ছায়া,
কোনো কাজের চাপ।
নিশ্চিন্তে চোখ দুটো পলক নামায়।
সে ঘুমে মগ্ন,
কণ্ঠে নেই কোনো আওয়াজ,
নেই তার চলার পদধ্বনি।
চোখ বুজে সে পালন করে চলেছে
নীরবতার মন্ত্র।
ঘুমে ডুবে যাচ্ছে
কণ্ঠ নিস্তব্ধ, অঙ্গ গতিহীন।
চোখ বুজে সে মন্ত্রোচ্চারণ করে
নীরবতার বাণী।
সারাদিনের উল্লাসে ক্লান্ত চোখ
অবশেষে খুঁজে নেয় নিঝুমতা।
শান্তির নিশ্বাস ফেলে
পা বাড়ায় নিশ্চিন্ত নিদ্রায়।
ঘুমন্ত নগরী ঘুমের ঘোড়ায়
স্বপ্নের দেশে খোঁজে চিত্তচাঞ্চল্য।
সারাদিনের উন্মত্ততা, উল্লাসের ঢেউয়ের ভারে
পদাভারে শরীর হারিয়েছে জোর।
শূন্যতার শেকড়ে আঁকড়ে ধরে
শুধুই শোনে বাতাসের শনশন সুর
যেন নীরবতারই ভাষা শোনায়।
একাকীত্বের যন্ত্রণা চেপে নিশ্চুপ,
দেখার কেউ নেই চারপাশে,
নেই কোনো পদচিহ্ন,
কোনো নিশ্বাসের ধ্বনি।
ভৌতিকতার আচ্ছাদনে ঘেরা প্রকৃতি—
পথের ধারের গাছপালা
প্রেতাত্মার ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে।
পাতার মরমর ধ্বনি
ভূতুড়ে হাসি হয়ে ভেসে আসে।
অলিতে গলিতে ম্রিয়মাণ ছায়া,
প্রাণহীন মরুপ্রান্তরে ডুবন্ত প্রকৃতি,
রাস্তাঘাট শবের শীতলতা বুকে নিয়ে
ডুবে আছে নিঃশ্বাসহীন শূন্যতার গভীরে।
অচেনা আগন্তুক বেশে
সাঁঝের বাতির আলো ছড়িয়ে
হঠাৎ গৃহপ্রবেশ।
আজন্ম বন্ধনে জড়িয়ে
আগামীর পথচলার সঙ্গী।
মায়াবী জাল ছড়িয়ে দেয়,
সে জালে জীবন একেবারে আটকে যায়,
পারে না নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে।
তারই আঁচলে আবরিত প্রতিক্ষণ,
শেষ প্রহর অবধি পৌঁছতে হবে
এ আবরণ সহিত।
এ আঁচল ছিন্ন হলে চলার পথ কণ্টকাকীর্ণ,
শেষ প্রহর পার হতে হবে
বন্ধন সহিত।
অন্তরের গহীনে ছোট এক ঘর,
সে ঘরের দরজায় কড়া নাড়ে বিধাতা।
সর্বোচ্চ সিংহাসনে আরোহন করিলেন তাকে,
জল্পনা কল্পনার আর ঠাঁই নেই সেথা।
ঠং ঠং কণ্ঠে মন্দিরের চিৎকার
দূর-দূরান্তের কর্ণ ভেদ করে
ঠাকুরের চরণে টেনে আনে।
ধূপের ধোঁয়ায় মিশ্রিত প্রাণের প্রণামগুলো
ধুয়ে দেয় ঠাকুরের চরণ।
প্রত্যেক ফুলের শরীরে ছোঁয়ানো
মনের সকল আকাঙ্ক্ষার সুবাস।
গঙ্গার এক ফোটা জলে অন্তর স্নান করে,
কালো পর্দার আড়াল থেকে
পরিশুদ্ধ মন ডানা মেলে।
মসজিদের মিনার হতে
সুমধুর আজানের ঢেউয়ে
শান্ত প্রাণগুলো প্লাবিত হয় নামাজের বানে।
জায়নামে নত শত শির,
শূন্য দু’হাত ভিক্ষার তরে
সমর্পিত খোদার দরবারে।
চায়ের কাপের ধোঁয়ায় বয়ে যায়
দাম্পত্যের খণ্ডচিত্র।
চায়ের সিক্ত উষ্ণ হৃদয় ছবি আঁকে
মায়া-মমতার এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গের।
মায়ার আঁচলে জীবন জড়িয়েছে
এ মায়া ছিন্ন করে আগের জীবনে ফেরার নেই কোনো পথ।
মাথার উপরে কালো উদ্যান সেজেছে
নতুন আবরণে।
গায়ে পরে রূপালি আলোকসজ্জার অলংকার।
শূন্যে হারানো আত্মারা
জ্যোতিতে জ্যোতিতে মিশে আছে
আজও ফেলে যাওয়া হৃদপানে।
বিচ্ছিন্ন প্রাণগুলো আজ সময়ের জালে আবদ্ধ,
আপন প্রাণগুলো আজ ভীষণ পর।
হারানো উন্মত্ততায় পূর্ণ পেয়ালায়
ডোবার তেষ্টায় বিদীর্ণ জীবন।
রঙ হারিয়ে পাণ্ডুর অন্তর,
ধূসরে সিক্ত জীবন।