• বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬, ১২:২৬ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]

গল্প: অট্টহাসির শবযাত্রা

Reporter Name / ১৫ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬

কলমে: আয়শা আক্তার

শহরের উপকন্ঠে পরিত্যক্ত সেই সার্কাস প্যান্ডেলটি এখন শকুনের আস্তানা। বছর কুড়ি আগে এখানে ডা. জুয়েল এর লাশ পাওয়া গিয়েছিল। তার পর থেকেই সার্কাসটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পরে আছে। লোকে বলে ওখানে হাসলে নাকি কান্না ফেরত আসে, আর কাঁদলে শোনা যায় পৈশাচিক হাসি। রায়হান পেশায় একজন ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট। তাই এসব অলৌকিকতায় তার বিশ্বাস নেই। সে তার কাজের সূত্রে এখানে এসেছে কিন্তু কে জানত তার এই যাত্রাই শেষ যাত্রা হবে। রায়হানের দুই মেয়ে মায়া ও ইকরা।

২৭শে নভেম্বর, প্যান্ডেলের ভেতরে ভ্যাপসা গুমোট। রায়হান টর্চ জ্বালাতেই দেখল সামনে একটা বিশাল আয়না। আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে সে চমকে উঠলো। তার ঠোঁট দুটো কানের লতি পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে আছে, মুখে এক অদ্ভুত হাসি। অথচ রায়হান ছিল পুরোপুরি গম্ভীর।

হঠাৎ অন্ধকার থেকে একটা জীর্ণ জোকার বেরিয়ে এলো। তার পরণে তালি দেওয়া রঙিন পোশাক কিন্তু মুখটা প্লাস্টিকের নয়। মনে হচ্ছে মানুষের চামড়া কেটে সেলাই করা হয়েছে। জোকারটি কোনো কথা না বলে রায়হানের সামনে একটা কাঁচের বয়াম ধরলো। ভেতরে টলটলে তরল আর দুটো ভাসমান চোখ। রায়হান লক্ষ্য করলো, জোকারটির গলার কাছে একটা জন্মদাগ। হুবহু তার বন্ধু জুয়েলের মতো। রায়হান চিৎকার করে উঠলো, “জুয়েল? তুই বেঁচে আছিস?”
জোকারটি এবার হাসল না, বরং তার চোখ দিয়ে গলগল করে রক্ত ঝরতে শুরু করলো। সে ইশারায় রায়হানকে ভেতরের একটা ঘরে নিয়ে গেল। সেখানে সারি সারি চেয়ারে মানুষ বসে আছে। না, তারা মানুষ নয় মানুষের কঙ্কাল। যাদের মুখে জোর করে বড় বড় হাসির মেটাল ক্লিপ পড়ানো। তাদের গাল চিরে দেওয়া হয়েছে যাতে মৃত্যুর পরেও হাসিটা স্থানী হয়।
রায়হান দেখল, ঘরের মাঝখানে একটা বড় কড়াইয়ে কি যেন ফুটছে। সেখান থেকে একটা বিভৎস গন্ধ আসছে। জোকারটি ইশারায় বোঝাল, এখানে হাসির বিনিময়ে জীবন কেনা হয়। রায়হান আর নিজেকে সামলাতে পারলো না সে ডুকরে কেঁদে উঠলো। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, রায়হানের চোখের পানি যখন মাটিতে পড়ছে জোকারটি তখন যন্ত্রণায় ছটফট করছে।
জোকারটি তার মুখোশ খুলল। ভেতরে ডা. জুয়েলের মুখ নয় বরং মায়ার মুখ! জোকারটি আর্তনাদ করে বলল, ❝তুই কাঁদছিস কেন? তুই তো হাসতে এসেছিস!❞
রায়হান বুঝতে পারলো না কি হচ্ছে। সে নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে দেখল তার হাত দুটো নীল হয়ে আসছে। তখনই জোকারটি ফিসফিস করে বলল, নাটক তো সবাই করে। আমাদের জীবনটাই তো একটা নাট্যমঞ্চ। কিন্তু এই মঞ্চের কার নাটক সবার সেরা সেটা বুঝতেই গোটা জীবন পার হয়ে যায়। 
সৃষ্টির আদি লগ্ন থেকেই এই নাটকের সূচনা,  শুধু সময়ের পালাবদলে চরিত্রের পরিবর্তন ঘটে আসছে। তাইতো প্রতিনিয়ত নাট্যমঞ্চে দাঁড়িয়ে সেরা নায়ক/ নায়িকার নাটক দেখে যাই। কখনো কখনো আবার নিজেরাই সেরা নায়ক/ নায়িকা হওয়ার নাটক করে যাই। 
কি অদ্ভুত তাই না….?
এটাই হয়তো নাটকের নিয়ম—

❝হয় দেখাও নয় দেখ!❞
হঠাৎ রায়হান দেখল, তার চারপাশের সেই কঙ্কালগুলো উঠে দাঁড়িয়ে তালি দিচ্ছে। তার গাল দুটো নিজে থেকে চিরে যেতে শুরু করলো। একটা ছুরি তার ঠোঁটের দুপাশ কেটে কানের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। রক্তে ভিজে যাচ্ছে তার শার্ট। সে কাঁদতে চাইছে কিন্তু তার গলা দিয়ে অট্টহাসির শব্দ বের হচ্ছে।

পরদিন পুলিশ প্যান্ডেলে রায়হানের ক্যামেরাটা খুঁজে পায়। তাতে শেষ ফুটেজ ছিল তার নিজের সেলফি ও ভিডিও। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, সে একাই প্যান্ডেলের ভেতরে দাঁড়িয়ে নিজের গাল নিজেই ছুরি দিয়ে কাটছে আর পাগলের মতো হাসছে।
দীর্ঘদিন তদন্তের পরে পুলিশ জানতে পারে, রায়হান পেশায় একজন সাংবাদিক হলেও এর পেছনে ছিল তার গোপন সাম্রাজ্য। সে ছিল একজন নারী ও শিশু পাচারকারী। সে তার এই পাপের রাজত্বের বিস্তৃতির জন্য যেকোনো কিছু করতে পারতো। তার এই গোপন চক্রান্ত সম্পর্কে ডা. জুয়েল জানতে পেরেছিলো। যেকারণে সে নিদ্ধিধায় ডা. জুয়েলকে খুন করেছে। অথচ ডা. জুয়েল ছিল তার একমাত্র ঘনিষ্ঠ বন্ধু।
কিন্তু প্রশ্নেরা এখনো উঁকি দেয়, খুনটা মায়া কেন করলো? মায়া তো তার বড় মেয়ে। না। মায়া তার নিজের মেয়ে না। মায়া হলো ডা. জুয়েলের একমাত্র মেয়ে। জন্মের সময় তার মা মারা যায়। বাবার মৃত্যুর সময় তার বয়স ছিল মাত্র ১ বছর। তখন থেকেই সে রায়হানের পরিচয়ে বড় হয়েছে। কিন্তু হঠাৎ করে মায়া সবকিছু জেনে ফেলে। তখন থেকেই সে লক্ষ্য স্থীর করে ফেলে ‘খুনের বিনিময়ে খুন!’ রায়হানের মৃত্যুর সময় অশ্রুসিক্ত কন্ঠে মায়া বলেছিল, আপনাকে তো আমি নিজের বাবা জানতাম। অথচ কি নিদারুণ অভিনয়ে, মঞ্চের সেরা অভিনেতার পুরষ্কার জিতে নিলেন আপনি। মনোমুগ্ধকর অভিনয় কি সবাই করতে পারে….বাবা? হৃদয় কাঁপানো অভিনেতা হওয়ার যোগ্যতা কি সবার থাকে??? 
দীর্ঘদিনের রাগ, অভিমান, ঘৃণা থেকে মায়ার মধ্যে জন্ম নেয় এক পৈশাচিক শক্তি। যার বিভীষিকাময় দহনে আটকে পড়ে রায়হান। ক্যামেরায় নকল ভিডিও ফুটেজ মায়া রেখেছিল কারন সবকিছুই তার পুর্ব প্ল্যান ছিলো। যার ফলে পুলিশ এখনো খুনিকে খুঁজে বের করতে পারেনি। সেদিন মায়ার কাঁদলেও রায়হানের মৃত্যু তাকে দিয়েছে অন্তহীন হাসি। অট্টহাসির শবযাত্রায় মায়া বলল, ❝মায়ার মায়া কে বুঝবে জগতে?❞


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
bdit.com.bd