সৌরভ হাসান আবির
দেখো জয়! দেখো চূর্ণ সঞ্চয়!
এই বিশ্বময় আমারই জয়।
আমারই জাগরণে উঠিয়াছি জাগিয়া—
পুরো বিশ্বভুবন ঘুরিয়া।
আমারই গর্জনে গর্জে, ভয়ে কাঁপে দিগন্ত;
জ্বলে ওঠে ধূলি—বিজয়মন্ত্রে অনন্ত।
আমার ভীম চরণ-পদচিহ্নে,
প্রতি পদে ব্রহ্মাণ্ড বিনাশে সর্বশ্বাসে!
মেতে ওঠে ঝলমলিয়ে সৃষ্টির উল্লাসে।
মহাকালের কালজয়ী কালভৈরব রূপে
পায়ের তলে পিষে মারিব দৈত্য-দানব।
আজ আমার হতে আমিই সৃষ্টি হয়েছি—লৌহ মানব।
আমি কভু হবো না ক্ষয়;
ক্ষয় হতে করিব জয়—
জগৎ বিশ্বময়।
অমরত্ব ত্যাগ করে কালকূট বিষ করি পান,
বয়ে আনি তীব্র মৃত্যুর তুফান।
মৃত্যু–অমৃত পারে দ্বার—
উচ্চ জয়ী শির কার?
মরণ তো রোজ দিল মেঁ হামারি,
মরণ যে ভুল গিয়া—
ওই তো আঁধারে ডুবে গিয়া।
ইহায় তাণ্ডব চলমান, চলমান দিগন্তে;
জ্বালিয়া অগ্নিশিখা, জ্বালিয়া আকাশপ্রান্তে।
ভস্মীভূত জগৎ হাহাকার করে,
প্রলয়-সমীরণ বহে—কম্পিত আকাশ ধরে।
মহাকালের রুদ্র রূপে হাসি জাগে,
ধূলিরে ধূলি জ্বলে—ভস্মে সব লেখা ঝাঁকে।
সৃষ্টি-ইতি ভস্মে লিখিত, ধ্বংসে জন্ম নয়া;
ধ্বংসের বুকে সূর্যোদয়—মহাজাগতিক ছায়া।
নতুন সাজে সজ্জিত আজ স্বর্গ হতে—
কে ধরে রাখবে শিব, শূল হাতে?
কে জানাবে সত্য? কে দেবে সত্যের তথ্য?
আজ উদার্ত আহ্বান জানাই ভৃগু-মানব—
আজ আমার হতে আমিই সৃষ্টি হয়েছি লৌহ মানব।
আমি অধর্মের শিকল চিরে আজ উঠিয়াছি—
এটাই সত্য, এটাই তথ্য।
মালাকুল মাউতের পরম সত্য—
মৃত্যুকে ঠেকিয়ে করিব
পাপের বিনাশ!
সে কথা শুনে লক্ষ খোদা কয়—
“সর্বনাশ! সর্বনাশ!”
আর আমি বলি—
তুমি অহংকারে ভেসেছ,
তুমি শক্তিকে ভেবেছ তোমার সম্বল;
কিন্তু শক্তি শুধু ভোগের নয়—
শক্তির নিয়ম ভেঙেছ তুমি।
তুমি অন্যায়ের আসক্ত, অধর্মে মত্ত।
কেবল কি আমারই স্মরণে
ভেসে আসে তাজা রক্তাক্ত প্রাণ?
কে আছো—দেবে তার আত্মদানে বলিদান?
ক্ষতবিক্ষত, রক্তাক্ত পড়ে আছে
বনে-বিলে, রাস্তার ধারে;
কুকুর, শিয়ালও লাশ নাহি ধরে—
গন্ধে তার ভারে।
আজ মানুষ নামে কিছু হায়নার রূপে,
হিংস্র জানোয়ার—
চিরে চিরে খাচ্ছে আজ
কত শত নবসৃষ্টির সূচনার প্রাণ!
নবজাগরণের আগেই তাহাকে
করে দিল ধ্বংস—
এ কি মানবজাতির
প্রশংসার অংশ?
না কি মরণ-উল্লাসের ছলকাহিনি—
হানাহানি, যুদ্ধ-বিগ্রহ,
দারিদ্র্য, দুর্দশা, অসাম্যের ইন্ধনল?
করিব আমিই উচ্চ জয়শ্রী তপস্যা।
আমি সদা সত্য পুরুষোত্তম জেনেছি;
আমারই পদচিহ্নের নিক্ষেপে
লক্ষ খোদার শির
নত করেছি।
অত্যাচার, লোভ, লালসা আর কাম—
গলা টিপে মেরেছি।
আজ এই ক্ষণে নতুন সৃষ্টির হবে সূচনা;
আর রবে না অত্যাচার—
খোদার উল্লাসের নাচনা।
ভয়ে পলে মর—
দেখি আজ তুমি বাঁচো কি না!
আমি করিব রণনীতি—
সে হবে আমারই শক্তি;
আমিই করিব বিশ্বময়
স্রষ্টার ভক্তি।
আজ কে দেবে বাঁধ?
আমিই ভেঙে নিব
পঞ্চগুণের সাধ।
আমি-ই আনিব ফিরিয়া,
মহাশূন্য, আকাশ-পাতাল ছাড়িয়া;
শত স্রোতে জাগ্রত চিরসত্য—
মুক্ত বোরহান হাতে ধরিয়া।
বাঁচাব নরকুণ্ডের নর,
শয়তানের হাত থেকে সর্বমানব—
আজ আমার হতে আমিই সৃষ্টি হয়েছি লৌহ মানব।
আজ আমার ভয়ে গিলসিল করে পান,
আর জমজম করে ত্যাগ।
দেখরে—চেয়ে দেখ, দৈত্য-দানব!
আজ আমার হতে আমিই সৃষ্টি হয়েছি লৌহ মানব।
যে ক্রন্দন-রোলের মাঝেও দেয় মোর সঙ্গ,
তার আঘাতে আমি হই নরসিংহ।
এ বিশ্বরে আমিই সত্য-মুক্ত বন্দন গাই—
ইলহাম আমিই সেই ঈশ্বর হতে পাই।
যিনি বলেন “কুন ফায়াকুন”—
আমি তাঁরই সেই বাণী দিয়ে
গাইবো তাঁরই গুণ।
আমি আছি তব সত্যপানে চেয়ে;
যে কালে, যে যুগে অধর্ম রবে—
সব বিনাশ করিতে আসিব
মরণ-প্রলয় উল্লাসে নব।
তাই আজ আমার হতে
আমিই সৃষ্টি হয়েছি—লৌহ মানব।
আমি এ ভুবনে মিছে আসিনি রে;
আসিয়াছি করিতে জাগ্রত।
আমি সত্য প্রভুর চরণে নত;
অপদেবতার কাছে নই নত—
আমি সদা শত স্রোতের জাগ্রত।
আমি এই বিশ্বে তীব্র দহন,
নতুন জগত গড়ার স্বপ্নচিত্র আঁকি;
আর পায়ের তলে পিষে মারি দৈত্য-দানব—
আজ আমার হতে আমিই সৃষ্টি হয়েছি লৌহ মানব।
ওরা মনে করে মদন-মদনা অলস,
ওরা জানে না রে—
আমিই স্বর্গ হতে ভরিয়ে আনি
অমৃতের কলস।
আজ কেউ যদি হয়ে থাকে নপুংসক,
তার আসবে না রে—আসবে না সুখ।
সে ভিতু, সে কাপুরুষ;
মরণকালে নেবে দুঃখের শ্বাস।
আজ যদি দেয় সে আমার সঙ্গ,
সেই করিবে স্বর্গবাস।
চারিদিকে উঠিবে জয়ের ধ্বনি—
সাবাস ভাই! সাবাস!
আর আমিই করিব অধর্মে বিনাশ—
“পরিত্রাণায় সাধূনাং,
বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্,
ধর্মসংস্থাপনার্থায়
সম্ভবামি যুগে যুগে।”
আর লক্ষ খোদা পুরে যাবে
আমারই কালকূট বিষের যন্ত্রণার ফুঁকে;
পদচিহ্ন আঁকি লাথিমারি শত বুকে।
জ্বলবে দিগন্ত, কাঁপিবে ধরা,
ছিন্ন হবে সময়ের শৃঙ্খল।
আমার নিঃশ্বাসে জ্বলে উঠিবে
মৃত্যুরই অগ্নিজ্বল অরুণকল।
আমি বিষ দেই—
তবু সে বিষে ফোটে
সৃষ্টিরই নূতন ফুল।
আমি হই বিনাশের নটরাজ,
আমারই ভয়ে কাঁপে দেবরাজ।
হীম শীতল শান্তির বাণী
ছড়িয়ে দেই পুষ্পফুল—
সর্ব কূল, মদিনার বুলবুল।
আর নতুন সৃষ্টির করি সূচনা,
আনি রজনব—
চারপাশে আসে সুবনব।
আজ আমার হতে আমিই সৃষ্টি হয়েছি—লৌহ মানব।
আজ এই ক্ষনে আমার দহনে ভস্ম হবে অধর্মের অন্ধকার,
আমার প্রলয়-শিখায় জ্বলে উঠবে নবপ্রভাত—
ধ্বংসের ছাই ভেদ করে আমি-ই লিখব সৃষ্টির শেষ জয়গান!