মোঃ আকতারুল ইসলাম আক্তার, ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি:
ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল পৌরসভায় বার্ষিক উন্নয়ন প্রকল্প (এডিপি) বাবদ প্রায় ১ কোটি টাকার বিশেষ সরকারি বরাদ্দ পৌর পরিষদের সাধারণ সদস্যদের অন্ধকারে রেখে গোপন করার অভিযোগ উঠেছে পৌর প্রশাসনের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দ এলেও তা পরিষদের মাসিক সভায় যথাযথভাবে উপস্থাপন বা আলোচনা করা হয়নি। এ ঘটনায় পরিষদের সদস্য ও স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, পৌর প্রশাসক, পৌর প্রকৌশলী এবং প্রভাবশালী কয়েকজন ঠিকাদারের যোগসাজশে প্রকল্পের অর্থ অনিয়মের মাধ্যমে ব্যয়ের চেষ্টা চলছে। তাদের আশঙ্কা, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করলে সরকারি উন্নয়ন তহবিল অপচয় বা আত্মসাতের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি বছরের ২৭ মে বার্ষিক উন্নয়ন প্রকল্প (এডিপি) বাস্তবায়নের জন্য রাণীশংকৈল পৌরসভার অনুকূলে প্রায় ১ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী এ ধরনের বরাদ্দ ও প্রকল্পের বিষয়ে পৌর পরিষদের মাসিক সভায় আলোচনা করে রেজুলেশন পাস হওয়ার কথা। তবে অভিযোগ রয়েছে, বরাদ্দ পাওয়ার পরও বিষয়টি পরিষদের সাধারণ সদস্যদের জানানো হয়নি। এদিকে পরিষদের অনুমোদন ছাড়াই তড়িঘড়ি করে ফাইল প্রস্তুত করে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাণীশংকৈল পৌর পরিষদের নিয়োগপ্রাপ্ত সাধারণ সদস্য ও রাণীশংকৈল থানার ওসি আমানুল্লাহ আল বারী বলেন, এডিপির বিশেষ বরাদ্দ এসেছে—এ বিষয়ে তার কোনো ধারণা নেই।
একই ধরনের বক্তব্য দেন পৌর পরিষদের সদস্য উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা আব্দুস সামাদ এবং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কামাল আহমেদ। তারা বলেন, বিশেষ কোনো বরাদ্দ এসেছে কি না তা তাদের জানা নেই। পরবর্তী সভায় বিষয়টি জানতে পারবেন বলে আশা করছেন। তাদের ভাষ্য, এসব বিষয় সাধারণত পৌর প্রশাসক ও প্রকৌশল শাখা দেখাশোনা করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পৌর পরিষদের এক সদস্য অভিযোগ করেন, শুধু এ বরাদ্দ নয়, পৌরসভার বিভিন্ন উন্নয়ন কাজেও সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের সদস্যদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। কাজের মান নিয়ে আপত্তি তুললেও প্রশাসক বা প্রকৌশলী গুরুত্ব দেন না। এমনকি ঠিকাদাররাও সদস্যদের মতামতকে আমলে নেন না। তিনি বলেন, “প্রশাসককে যেমন সরকার নিয়োগ দিয়েছে, তেমনি আমাদেরও সরকার নিয়োগ দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে আমাদের কোনো মূল্যায়ন করা হয় না।”
এ বিষয়ে পৌরসভার হিসাবরক্ষক শাহাজাহান আলীর কাছে জানতে চাইলে তিনি বরাদ্দসংক্রান্ত তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। কত টাকা বরাদ্দ এসেছে—এ প্রশ্নেরও জবাব দেননি।
পরে পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিজ খাদিজা বেগমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি শুধু বরাদ্দের তথ্য নিশ্চিত করেন। তবে অন্যান্য বিষয়ে হিসাবরক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। তিনি জানান, “নিয়ম অনুযায়ী কাজ করা হবে।”
পৌর প্রকৌশলী এস এম জাবেদ আলী বলেন, পৌর পরিষদের সদস্যদের সভার স্বাক্ষর রয়েছে। দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সময় স্বল্পতার কারণে আরএফকিউ (RFQ) পদ্ধতিতে কাজের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এদিকে পৌর প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে কয়েকজন প্রভাবশালী ঠিকাদারের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিযোগও উঠেছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে তার বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন মহলের দাবি, বিষয়টি দ্রুত নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা না হলে সরকারি উন্নয়ন তহবিলের সুষ্ঠু ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাবে এবং নাগরিকরা প্রত্যাশিত সেবা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। ইতোমধ্যে এ বরাদ্দ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে, যা স্থানীয় প্রশাসন ও সরকারের ভাবমূর্তিতে প্রভাব ফেলছে বলে অনেকের অভিমত।