কলমে: আফরিন চৌধুরী
পুরোনো ঢাকার এক পরিত্যক্ত পাঁচতলা ভবন নিয়ে বহু বছর ধরে অদ্ভুত একটি গুজব ছড়িয়ে আছে। এলাকার মানুষ রাত নামার পর ভবনটির পাশ দিয়েও হাঁটে না। তাদের বিশ্বাস, গভীর রাতে ছাদের কিনারায় একটি কালো বিড়াল বসে থাকে। কেউ যদি ভুল করে তার সবুজ চোখের দিকে তাকায়, সে আর আগের মানুষ থাকে না।
রাফি, একজন ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফার, এসব গল্পকে নিছক কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দিত। রহস্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সত্য খুঁজে বের করাই ছিল তার নেশা। তাই এক পূর্ণিমার রাতে ক্যামেরা, টর্চ আর ট্রাইপড নিয়ে সে ঢুকে পড়ল সেই ভবনে।
ভাঙা সিঁড়ি, স্যাঁতসেঁতে দেয়াল, বাতাসে জমে থাকা পচা গন্ধ আর চারদিকে অস্বাভাবিক নীরবতা—সব মিলিয়ে জায়গাটা যেন বহু বছর ধরে নিঃশ্বাস আটকে অপেক্ষা করে আছে।
তৃতীয় তলায় পৌঁছাতেই সে থেমে গেল।
অন্ধকার করিডরের শেষে নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে একটি কালো বিড়াল। তার দুটি সবুজ চোখ অন্ধকার ভেদ করে জ্বলছে।
রাফি ক্যামেরা তুলে ছবি তুলল।
ফ্ল্যাশের আলো মিলিয়ে যেতেই সে ক্যামেরার স্ক্রিনে তাকাল।
তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
ছবিতে বিড়ালটি নেই।
বরং সেখানে দাঁড়িয়ে আছে এক কিশোর। ফ্যাকাশে মুখ, ছেঁড়া কাপড়, আর চোখ দুটো ঠিক বিড়ালের মতো সবুজ।
রাফি তাড়াতাড়ি মাথা তুলে সামনে তাকাল।
সেখানে আবার সেই একই কালো বিড়াল।
এবার বিড়ালটি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। একবারও পেছনে না তাকিয়ে করিডর ধরে হাঁটতে শুরু করল।
অজানা এক টানে রাফিও তার পিছু নিল।
চতুর্থ তলায় একটি মরিচা ধরা লোহার দরজার সামনে এসে বিড়ালটি থামল। দরজাটি আধখোলা। ভেতর থেকে ভেসে আসছে তীব্র পচা গন্ধ।
টর্চের আলো ফেলতেই রাফি স্তব্ধ হয়ে গেল।
দেয়ালজুড়ে ঝুলছে শত শত ছবি।
প্রতিটি ছবিতে একজন মানুষ।
আর তার পাশেই একই কালো বিড়াল।
ছবিগুলোর নিচে লেখা রয়েছে নাম আর তারিখ। কিছু তারিখ প্রায় একশো বছরের পুরোনো।
রাফির চোখ হঠাৎ শেষ ছবিটির ওপর গিয়ে আটকে গেল।
সেখানে দাঁড়িয়ে আছে সে নিজেই।
তার পাশেই বসে আছে সেই কালো বিড়াল।
ছবিটি আজ রাতের।
কিন্তু এই ছবি তো সে কখনো তোলেনি।
ঠিক তখনই তার পেছন থেকে ফিসফিস করে একটি কণ্ঠ ভেসে এল—
“চোখ ফিরিয়ে নিতে অনেক দেরি হয়ে গেছে।”
রাফি ঘুরে দাঁড়াল।
কেউ নেই।
শুধু বিড়ালটি।
এবার সে সরাসরি বিড়ালটির চোখের দিকে তাকিয়ে ফেলল।
মুহূর্তেই চারপাশের অন্ধকার যেন তার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
তারপর আর কিছু মনে নেই।
পরদিন সকালে ভবনটির সামনের ভাঙা সিঁড়ির নিচে অচেতন অবস্থায় রাফিকে উদ্ধার করে পুলিশ। তার শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল না। হাসপাতালে জ্ঞান ফেরার পর সবাই জানতে চাইল, ভবনের ভেতরে কী ঘটেছিল।
রাফি অনেকক্ষণ চুপ থেকে কাঁপা গলায় শুধু একটি কথাই বলল—
“ওর চোখের দিকে… কখনো তাকিয়ো না…”
এরপর থেকে সে আর কোনোদিন ক্যামেরা হাতে নেয়নি। ফটোগ্রাফির সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে দেয়। কেউ তার চোখের দিকে তাকালে সে অস্বস্তিতে মুখ ফিরিয়ে নিত। যেন সেই সবুজ চোখ আজও তাকে অনুসরণ করছে।
কয়েক মাস পরে শহরের একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে রাফির পুরোনো ছবিগুলো প্রদর্শনের আয়োজন করা হয়।
দর্শকদের ভিড়ের মধ্যে এক তরুণ শেষ ছবিটির সামনে এসে থমকে দাঁড়াল।
ছবিটি সেই পরিত্যক্ত ভবনের করিডরের।
কিন্তু সেখানে রাফি নেই।
পুরো ফ্রেমজুড়ে শুধু একটি কালো বিড়াল বসে আছে।
তার দুটি সবুজ চোখ যেন ছবির ভেতর থেকেও জীবন্ত হয়ে তাকিয়ে আছে।
তরুণটি অজান্তেই আরও কাছে এগিয়ে গেল।
তার চোখ আটকে গেল বিড়ালটির চোখে।
পরদিন সকাল থেকে সেই তরুণটির আর কোনো খোঁজ পাওয়া গেল না।
নিখোঁজ ডায়েরি করা হলো, খোঁজ চলল বহুদিন। কিন্তু তার কোনো সন্ধান মেলেনি।
কয়েক দিন পর প্রদর্শনীর কর্মীরা শেষ ছবিটি সরাতে গিয়ে থমকে দাঁড়াল।
ছবিটা যেন আগের মতো নেই।
কালো বিড়ালটির পাশে এখন দাঁড়িয়ে আছে আরেকজন মানুষ।
মুখে আতঙ্কের ছাপ।
সে আর কেউ নয়—সেই নিখোঁজ তরুণ।
শুধু বিড়ালটি আগের মতোই নিশ্চুপ বসে আছে।
তার দুটি সবুজ চোখ যেন ছবির ভেতর থেকে আবার কারও জন্য অপেক্ষা করছে….