মোঃ আকরাম হোসেন রতন, পূর্বধলা (নেত্রকোনা) প্রতিনিধি:
দেশের শীর্ষ বিদ্যাপীঠ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে ডিগ্রি অর্জনের পর অনেকের স্বপ্ন থাকে দেশ-বিদেশের নামিদামি প্রতিষ্ঠানে উচ্চ বেতনের চাকরি করা। কেউ প্রকৌশলী, কেউ ব্যাংকার হয়ে গড়ে তোলেন বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার। তবে প্রচলিত সেই ধারণার বাইরে গিয়ে ভিন্ন এক জীবন বেছে নিয়েছেন নেত্রকোনার মেয়ে নাইলা সারাফ লিজা। প্রকৌশলী ও ব্যাংকার হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা পেছনে ফেলে তিনি এখন নেত্রকোনা সদর উপজেলার পঞ্চাননপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। সেখানে তিনি শুধু শিক্ষক নন, শিশুদের কাছে প্রিয় ‘লিজা আপা’ ও একজন কাছের বন্ধু।
নাইলা সারাফ লিজার জন্ম ও বেড়ে ওঠা রাজধানী ঢাকায়। কাস্টমস কর্মকর্তা বাবার একমাত্র আদরের মেয়ে হিসেবে মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোডে স্বাচ্ছন্দ্যময় পরিবেশে কেটেছে তাঁর শৈশব-কৈশোর। ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়াশোনা শেষে বুয়েট থেকে অর্জন করেন প্রকৌশলবিদ্যার ডিগ্রি। ঢাকার নাগরিক জীবনের সঙ্গে অভ্যস্ত হলেও জন্মসূত্রে তাঁর শিকড় নেত্রকোনায়। বাবার বাড়ি ও দাদার বাড়ির সূত্রে এ জেলার সঙ্গে রয়েছে তাঁর গভীর আত্মিক টান।
বিশেষ সূত্রে জানা যায়, বুয়েট থেকে পড়াশোনা শেষ করে ২০০৯ সালের দিকে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন লিজা। প্রথমে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে (এলজিইডি) সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে ২০১১-১২ সালের দিকে যোগ দেন জনতা ব্যাংকে। তবে প্রকৌশলী কিংবা ব্যাংকার—কোনো পেশাতেই দীর্ঘদিন নিজেকে আটকে রাখতে পারেননি তিনি।
নিজের পেশাগত অভিজ্ঞতা সম্পর্কে লিজা বলেন, “জব তো কখনো খারাপ হয় না। তবে আমার নিজেকে কখনো মনে হয়নি যে ওই জবগুলোতে আমি খুব বেশি ফিট।”
মনের ভেতরের সেই তাগিদ থেকেই ২০১৭ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন নেত্রকোনার পঞ্চাননপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। বুয়েটের একজন স্নাতক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন—বিষয়টি অনেকের কাছে ছিল বিস্ময়কর। শুরুতে লিজার নিজের মনেও দ্বিধা ছিল। প্রথম তিন মাস তাঁর মনে হয়েছিল, এই পরিবেশে তিনি থাকতে পারবেন কি না। কিন্তু সহকর্মীদের আন্তরিকতা এবং শিশুদের মায়াভরা মুখ ধীরে ধীরে তাঁকে আপন করে নেয়।
এরপর বিভিন্ন সময়ে নতুন চাকরির প্রস্তাব এলেও তিনি শিক্ষকতা ছেড়ে যাননি। শিশুদের সঙ্গে গড়ে ওঠা আত্মিক সম্পর্কই তাঁকে এ পেশায় ধরে রেখেছে। প্রায় আট বছর ধরে তিনি ভালোবাসা ও মমতা দিয়ে শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন।
লিজার কাছে শিক্ষকতা মানে শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু পড়িয়ে দেওয়া নয়। শিশুদের শেখার আগ্রহ তৈরি করা, তাদের মানসিক বিকাশে সহায়তা করা এবং আত্মবিশ্বাসী করে তোলাকেই তিনি গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, একজন ভালো শিক্ষক হওয়ার জন্য উচ্চতর ডিগ্রির পাশাপাশি শিক্ষাদান পদ্ধতি সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান থাকা জরুরি।
তিনি বলেন, “শিক্ষক হওয়ার জন্য শিশুদের ভেতরে প্রবেশ করতে পারা এবং তাদের মোটিভেট করার ক্ষমতা থাকা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। আমি নিজেকে খুব সাধারণ একজন মানুষ মনে করি। আমি শুধু ওদের মোটিভেট করার চেষ্টা করি, উৎসাহ দিই। শিক্ষার্থী নিজে থেকে না শিখলে আমি সারাদিন ঘ্যানঘ্যান করলেও কোনো লাভ হবে না।”
শ্রেণিকক্ষে লিজার পাঠদানের ধরনও কিছুটা আলাদা। তিনি শিক্ষার্থীদের কাছে ভীতিকর বা কঠোর শিক্ষক হয়ে উঠতে চান না; বরং তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। টিফিনের সময় শিশুদের সঙ্গে বসে খাবার ভাগাভাগি করে খান। এতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক আরও সহজ ও আন্তরিক হয়ে ওঠে।
লিজার ভাষায়, “আমি যখন পড়াই, তখনো যদি কেবল নিজেকে শিক্ষক মনে করি, তাহলে ওরা আমাকে ভয় পাবে। আমি ক্লাসে ওদের বন্ধু। ওরা কোনো ভুল করলেও নির্দ্বিধায় আমার কাছে স্বীকার করতে পারে।”
শিক্ষকতার পাশাপাশি সাহিত্যচর্চা, ছবি আঁকা, নাচ, গান ও আবৃত্তির প্রতিও রয়েছে তাঁর গভীর অনুরাগ। নিজের সাংস্কৃতিক চর্চার অভিজ্ঞতা তিনি শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ছড়িয়ে দিতে চান। তাঁর বিশ্বাস, প্রাথমিক পর্যায়ে শিশুদের পাঠ্যবইয়ের শিক্ষার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা হলে তাদের সৃজনশীলতা ও মানসিক বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকা পড়ে।
ঢাকার ব্যস্ত ও যান্ত্রিক জীবন ছেড়ে বর্তমানে নেত্রকোনাতেই স্বামী ও তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া একমাত্র ছেলেকে নিয়ে বসবাস করছেন লিজা। তাঁর ছেলেও পড়াশোনা করছে মায়ের কর্মস্থল পঞ্চাননপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। নেত্রকোনার মানুষের পারস্পরিক সম্প্রীতি, আন্তরিকতা ও সামাজিক বন্ধন তাঁকে মুগ্ধ করেছে। শুরুতে যাতায়াত ও মফস্বলের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে কিছুটা অসুবিধা হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি এখানকার জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন।
নাইলা সারাফ লিজার জীবনযাত্রা প্রমাণ করে, বড় ডিগ্রি অর্জনের সার্থকতা কেবল বড় পদ বা উচ্চ বেতনের চাকরিতে সীমাবদ্ধ নয়। নিজের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা দিয়ে সমাজের তৃণমূল পর্যায়েও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সম্ভব। যত দিন বাংলাদেশে থাকবেন, তত দিন শিক্ষকতা পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তিনি।
বুয়েটের এই মেধাবী শিক্ষার্থী হয়তো এখন বড় কোনো অবকাঠামো প্রকল্পের নকশা আঁকছেন না; বরং প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে শিশুদের স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। আর শিশুদের সেই ভবিষ্যৎ নির্মাণেই নিজের জীবনের সার্থকতা খুঁজে পেয়েছেন নাইলা সারাফ লিজা।