কলমে: মারিয়াম রামলা
পরের বাড়ি যাব, নাকি পরের বাড়ি থেকে যাব?
ছোটবেলা থেকেই একটি মেয়েকে সবসময় এই কথাটিই বলা হয়, তার আসল বাড়ি নাকি শ্বশুরবাড়ি। তাহলে সবাই কেন বলে, “মেয়েদের তো এক না একদিন পরের বাড়িতে যেতে হয়…”? যদি ‘পরের বাড়ি’টাই তার শ্বশুরবাড়ি হয়, তাহলে বাবা-মা’র ঘরটি কি তবে তার নিজের বাড়ি নয়?
প্রতিটি পরিস্থিতিতেই মেয়েরা ‘পর’ হয়ে যায়। শৈশবকাল থেকে কত যত্নে, কত আদরে লেখাপড়া শিখিয়ে তার ছোট ছোট ইচ্ছেগুলো পূরণ করে তাকে বড় করা হয়… রান্না করতে গিয়ে সামান্য হাত পুড়লে বা খেলতে গিয়ে একটু আঘাত লাগলে যেন বাড়িতে ডাক্তার আর ওষুধের লাইন পড়ে যায়।
তারপর মলম লাগাতে লাগাতে তাকে এই সান্ত্বনা দেওয়া হয়-“এতটা নাজুক হোস না মা! শ্বশুরবাড়ি গিয়ে এত বড় সংসার সামলাতে হবে তোকে!”
“আমার রাজকুমারী” বলে বুকে টেনে নেন বাবা-মা, তারপর আবার ভবিষ্যতে সম্পত্তির ভাগ দিতে না হয় এই ভেবে সেই স্নেহের আবরণে সামান্য একটু দূরত্বও তৈরি করে নেন। কত সাজসজ্জা, কত গহনা, কত আকাঙ্ক্ষা আর দোয়া নিয়ে মেয়েকে বিদায় জানানো হয়! তখন তো মা-বাবা, ভাই-বোন, গোটা উঠোন জুড়ে অশ্রুতে ভিজে যায়। কিন্তু যেই না বিয়ের পরের দিনটি আসে, অমনি যেন সে ‘পরের’ হয়ে চৌকাঠে পা রাখে।
কত সুন্দর সুন্দর নামে একটি মেয়েকে সবাই ডাকে। কখনও মেয়ে, কখনও বউ, কখনও ভাবি, চাচী, জেঠানি, ননদ, শাশুড়ি-একদিন আবার ঠাকুমা হয়ে যায়। কিন্তু একটি মেয়ে শুধু এই কথাটিই বলে, “মায়ের বাড়ি যাব,” অথবা “শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছি।”
নতুন ঘর, নতুন মানুষ, নতুন কাজ, নতুন শিক্ষা। একটি ছোট ভুল হলেও বড় বড় কথা শুনতে হয়-“মা-বাবা কি শেখায়নি? কী ভাবে উঠোন ঝাড়ু দিতে হয়? কখনও কি দেখনি?
স্বামী বলে-“বড় আশা ছিল, শ্বশুরবাড়ি থেকে সোনার চেন আর একটি ঘড়ির সঙ্গে একটু সম্পত্তিও যদি পেয়ে যেতাম, সব তো তোমার ভাই লুটে নিল।” আর সন্তানেরাও আক্ষেপ করে,
বাবা তো সবসময় চেষ্টা করেছে, কিন্তু তুমি মা নানারবাড়ি থেকেও যদি কিছু আনতে, তাহলে আমাদের জীবনটা আরও ভালো হতো।” তবে কি একটি মেয়ে কেবল সকলের ইচ্ছে পূরণ করার জন্যই জন্মায়? আর নিজের সাধ-আহ্লাদ, স্বপ্নগুলো শুধু স্বপ্নের ভেতরেই ধামাচাপা পড়ে থাকবে?
ছোট-বড় সব ব্যাপারেই শুনতে হয়, “এসব তোমাদের বাড়িতে চলত, আমাদের ঘরে নয়।” আর বাবা-মাও বলে দেন, “এখানে ঠিকমতো থেকো। শ্বশুরবাড়ি গিয়ে ঘোরাঘুরি, ফূর্তি করো, নইলে ভালো সম্বন্ধ আসবে না।” কবে মেয়ে বড় হয়ে ওঠে আর বিয়ে হতেই ‘পর’ হয়ে যায়, তা কেউ টেরও পায় না।
ঘুড়ে ফিরে একটি মেয়ে একদিন অজান্তেই পর হয়ে যায়। বিয়ের আগে ‘বাবার বাড়ি’, আর বিয়ের পর ‘স্বামীর বাড়ি’। তাহলে একটা মেয়ের ‘আসল বাড়ি’ কোনটা?
ভাবতে ভাবতে কখন যে হারিয়ে যাই। একটি নতুন ভাবনায় তলিয়ে যাই-মেয়েরা পায়ের ধুলো নয়, ফুলের মতো ঘরকে সাজিয়ে তোলে। নারী কখনও নিজের জন্য ভাবে না, সে শুধু আপোষ করতে জানে।
নারীর জীবনটাই একটি বিরাট প্রশ্ন, আর সেই প্রশ্নের ভেতরেও লুকিয়ে থাকে আরও হাজারটা প্রশ্ন। সে অন্যের জন্য যতই করুক না কেন, শেষে একটি অসহায় নারীই তাকে বলা হয়…
এখন আর কী-ই বা বলব? পরের বাড়ি যাব, নাকি পরের বাড়ি থেকে যাব-?