চিত্রশিল্পী মিলন বিশ্বাস
দুচার লাইন লিখে, দুএকটি অনলাইন পত্রিকায়
লেখা প্রকাশিত হলেই কেউ কবি হয়ে যান না কবি হওয়া কোনো উপাধি নয়, এটি দীর্ঘ সাধনার ফলকবিতা শুধু কয়েকটি সুন্দর শব্দের সমাহার
নয়; কবিতার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে জীবনবোধ,
চিন্তার গভীরতা, পাঠাভ্যাস, ভাষার সৌন্দর্য,
অনুভূতির সততা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিজস্ব সৃষ্টিশীলতা।বর্তমানে অনলাইন পত্রিকা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম লেখালেখির জন্য অনেক বড় একটি ক্ষেত্র তৈরি করেছে।এটি অবশ্যই ইতিবাচক।কিন্তু প্রকাশিত হওয়াকে নিজের সাহিত্যিক
শ্রেষ্ঠত্বের সনদ মনে করার কোনো কারণ নেই।একটি লেখা প্রকাশিত হওয়া মানেই একজন
লেখক প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলেন এ ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা দরকার আরেকটি বিষয় আজকাল বিশেষভাবে চোখে
পড়ছে
প্রযুক্তি, বিভিন্ন অ্যাপস এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার
সহায়তায় লেখা তৈরি ও পরিমার্জনের প্রবণতা।প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে আমার কোনো আপত্তি নেই।সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তি আসবেই এবং একজন
লেখক চাইলে তা সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করতেই পারেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো প্রযুক্তি কি আপনার সহায়ক, নাকি আপনার চিন্তার বিকল্প একবার নিজেকে খুব সাধারণ একটি প্রশ্ন করুন ইন্টারনেট নেই, কোনো অ্যাপস নেই, নেটওয়ার্ক
বিচ্ছিন্ন; আপনাকে হঠাৎ একটি বিষয় দিয়ে বলা
হলো, “নিজের ভাষায় লিখুন।” তখন আপনি
কতটা লিখতে পারবেন?
এই প্রশ্নের উত্তরটি নিজের কাছেই খুঁজুন।কারণ প্রকৃত লেখকের পরিচয় শুধু প্রকাশিত
লেখায় নয়, তার নিজের চিন্তার শক্তিতে।
আমি নিজেকে বড় লেখক বা কবি দাবি করি না।আমার লেখায় ভুল থাকতে পারে, দুর্বলতা থাকতে পারে,সাহিত্যিক সীমাবদ্ধতাও থাকতে পারে।কিন্তু একটি বিষয়ে আমি নিজের কাছে পরিষ্কার আমি অন্যের লেখা কপি করে নিজের নামে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি না সাহিত্যে অন্যের ভাব, ভাষা বা সৃষ্টির কাঠামো
নিজের নামে ব্যবহার করা অত্যন্ত নিন্দনীয়।সরাসরি ‘চুরি’ শব্দটি ব্যবহার না করে একে‘
কুম্ভিলকতা’ বলা যায়।প্রকৃত লেখকের চোখ কিন্তু এসব বিষয় সহজেই
এড়িয়ে যায় না শব্দ, বাক্য, ভাবনা, উপস্থাপন ও লেখার ভঙ্গির
মধ্যে অনেক সময় সেই ধার করা সৃষ্টির ছাপ থেকে যায়। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো কেউ কেউ নিজের লেখা প্রকাশ করার পাশাপাশি আশপাশের লেখকদের লেখা থেকে অংশবিশেষ কেটে নিয়ে নিজের নামে ব্যবহার করছেন, আবার একই সঙ্গে অন্যের লেখাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করছেন নিজের লেখার প্রশংসা করা অপরাধ নয়; নিজের সৃষ্টিকে ভালোবাসাও অপরাধ নয় কিন্তু নিজেকে বড় প্রমাণ করতে গিয়ে অন্যের সৃষ্টিকে ছোট করা কখনোই প্রকৃত সাহিত্যচর্চার লক্ষণ
হতে পারে না। আপনি একটি পত্রিকায় লিখেছেন এটি আপনার অর্জন কিন্তু সেই অর্জনকে কেন্দ্র
করে আপনার চারপাশের লেখকদের লেখাকে
অবমূল্যায়ন করার অধিকার আপনাকে কেউ
দেয়নি। সাহিত্য কোনো প্রতিযোগিতার মাঠ নয়, যেখানে
অন্যকে নিচে নামিয়ে নিজেকে ওপরে তুলতে হবে।
মনে রাখবেন অন্যের লেখা কেটে নিজের লেখা বড় হয় না।
অন্যের সৃষ্টিকে ছোট করে নিজের সৃষ্টির মর্যাদা
বাড়ে না। আর দুচারটি কবিতা লিখে কবি দাবি করলেই
কবিত্ব অর্জিত হয় না কবিত্বের জন্য দরকার দীর্ঘ পাঠ, নিরন্তর চর্চা,
জীবনকে দেখার নিজস্ব চোখ এবং নিজের ভেতর থেকে কথা বলার সাহস। আমি হয়তো ভালো লিখি না।কিন্তু আমি অন্তত চেষ্টা করি আমার কথাগুলো
আমার নিজের হোক ভুল হলে আমার ভুল, দুর্বল হলে আমার দুর্বলতা তবু সেটি আমার নিজের সৃষ্টি।
তাই যারা সত্যিই লিখতে চান, তাদের প্রতি আমার অনুরোধ প্রথমে কবি হওয়ার চেষ্টা না করে, একজন ভালো পাঠক হোন প্রথমে নিজের বিবেককে শিক্ষিত করুন, তারপরশব্দকে সাজান কবিত্ব দেখানোর আগে বিবেককে জাগ্রত করুন।
প্রকাশের আগে নিজেকে প্রশ্ন করুন।
অন্যের লেখা নেওয়ার আগে নিজের কলমকে একবার সুযোগ দিন আর আমার এই কথাগুলো কারও মনে আঘাত
করলে, প্রতিউত্তর দেওয়ার আগে অন্তত পাঁচবার ভাবুন আমি কি কাউকে আঘাত করার জন্য কথাগুলো
বলেছি, নাকি আমাদের সাহিত্যচর্চাকে একটু
বেশি সৎ, সুন্দর ও স্বকীয় করার জন্য বলেছি?
শেষ কথা একটাই
কবিতা লেখা সহজ,
কিন্তু কবি হয়ে ওঠা কঠিন।
শব্দ সাজানো সহজ,
কিন্তু নিজের শব্দ সৃষ্টি করা কঠিন।
আর লেখক পরিচয় নেওয়া সহজ,
কিন্তু প্রকৃত লেখক হয়ে ওঠার জন্য চাই সাধনা, সততা, স্বকীয়তা ও বিবেক।
বিঃদ্রঃ আমি চিত্রশিল্পী মিলন বিশ্বাস প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৪০ জন লেখকের লেখা প্রকাশ করে দিয়ে থাকি তিনটা পত্রিকার সঙ্গে সংযুক্ত আছি। তাই উপযুক্ত প্রমাণ হাতে নিয়েই এই লেখাটি টাইপ করলাম।লেখাটা পড়ে কেউ কষ্ট পাবেন না আমার কাছে যেটা মনে হল সেটাই তুলে ধরলাম। আমি বাস্তবতা থেকে সব সময় শিক্ষা গ্রহণ করি।