মোঃ রায়হান পারভেজ নয়ন
স্টাফ রিপোর্টার নীলফামারী
বাবা কৃষক, মা গৃহিণী। সীমিত সামর্থ্যের সংসারে বেড়ে ওঠা সেই ছেলেই আজ বিচারক হওয়ার পথে। মেধা, অধ্যবসায় ও কঠোর পরিশ্রমকে সঙ্গী করে সাফল্যের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার পশ্চিম ছাতনাই ইউনিয়নের নূরপাড়া গ্রামের আবুসালে মোহাম্মদ নাসিম।
অষ্টাদশ বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস পরীক্ষা-২০২৫-এর চূড়ান্ত ফলাফলে মেধাক্রমে ৪৬তম হয়ে সিভিল জজ পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন তিনি। তাঁর এই অর্জনের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পরিবার, স্বজন, শিক্ষক ও এলাকাবাসীর মধ্যে বইছে আনন্দের জোয়ার। নূরপাড়া গ্রামে নেমে এসেছে উৎসবের আমেজ।
আবুসালে মোহাম্মদ নাসিমের বাবা আব্দুস সামাদ দুলু একজন কৃষক। মা গৃহিণী। চার ভাই-বোনের মধ্যে নাসিম সবার বড়। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল। কলেজের টেস্ট পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার খবর দাদা মজিবর রহমানকে জানালে তিনি নাসিমকে ভবিষ্যতে বিচারক হওয়ার স্বপ্ন দেখতে উৎসাহ দেন। দাদার সেই অনুপ্রেরণাই পরবর্তীতে তাঁর স্বপ্নকে আরও দৃঢ় করে।
পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত হলেও সন্তানদের পড়াশোনার ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের আগ্রহের কোনো ঘাটতি ছিল না। তাঁদের ত্যাগ, সহযোগিতা এবং নিজের অধ্যবসায়কে পুঁজি করে নাসিম এগিয়ে যেতে থাকেন। একপর্যায়ে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হয়ে আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন।
নাসিম ডিমলা উপজেলার পশ্চিম ছাতনাই ইউনিয়নের ছাতনাই উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ২০১৬ সালে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৪.৫৬ অর্জন করেন। পরে খগাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের জনতা ডিগ্রি মহাবিদ্যালয় থেকে ২০১৮ সালে বিজ্ঞান বিভাগে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পান। এরপর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
দীর্ঘ শিক্ষাজীবন শেষে বিচার বিভাগে ক্যারিয়ার গড়ার লক্ষ্যে বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস পরীক্ষায় অংশ নেন নাসিম। অষ্টাদশ বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস পরীক্ষা-২০২৫-এর চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর দেখা যায়, মেধাক্রমে ৪৬তম অবস্থান অর্জন করে সিভিল জজ পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন তিনি।
নাসিমের সাফল্যের সংবাদ এলাকায় পৌঁছানোর পর থেকেই তাঁকে ঘিরে শুরু হয় অভিনন্দনের বন্যা। নূরপাড়া গ্রামসহ পশ্চিম ছাতনাই ইউনিয়নের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তাঁর সাফল্যে আনন্দ প্রকাশ করেন। কৃষক পরিবারের সন্তান হয়ে বিচার বিভাগে প্রবেশের সুযোগ পাওয়ায় স্থানীয়দের অনেকেই এটিকে এলাকার জন্য গর্বের অর্জন হিসেবে দেখছেন।
পরিবারের সদস্যরা জানান, নাসিমের এই সাফল্য তাঁদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ করেছে। কৃষিকাজ করে সন্তানদের পড়াশোনা করানো বাবা আব্দুস সামাদ দুলুর পরিবারের জন্য এটি বিশেষ আনন্দের মুহূর্ত। স্বজনদের প্রত্যাশা, কর্মজীবনে নাসিম সততা, ন্যায় ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবেন।
নাসিমের এই অর্জন শুধু তাঁর পরিবারের নয়, নূরপাড়া গ্রামের মানুষের কাছেও আনন্দ ও গর্বের। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে যে সাফল্যের শিখরে পৌঁছানো সম্ভব, তাঁর পথচলা সেই বার্তাই দিচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।