নিজস্ব প্রতিবেদক:
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (RMG) শিল্পে কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারীদের বিদ্যমান নিম্নতম মজুরি পুনর্নির্ধারণের লক্ষ্যে অবিলম্বে নিম্নতম মজুরি বোর্ড পুনর্গঠন ও কার্যক্রম শুরুর দাবি জানিয়েছে গার্মেন্টস শ্রমিক পরিষদ।
এ দাবিতে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রীর কাছে লিখিত আবেদন করেছেন সংগঠনটির আহ্বায়ক লাভলী ইয়াসমীন ও সদস্য সচিব নাহিদুল হাসান নয়ন।
আবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের অর্থনীতি, রপ্তানি আয় ও কর্মসংস্থানে তৈরি পোশাক শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এ শিল্পের সাফল্যের পেছনে শ্রমিকদের দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, দক্ষতা ও নিরলস শ্রম গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। বিশেষ করে নারী শ্রমিকরা এ খাতের উৎপাদনশীলতা ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ধরে রাখতে বড় ভূমিকা পালন করছেন।
গার্মেন্টস শ্রমিক পরিষদ বলছে, ২০২৩ সালে তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের জন্য বর্তমান নিম্নতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি গেজেট ২০ ডিসেম্বর ২০২৩ প্রকাশিত হয়। সংগঠনটির দাবি, বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ধারা ১৩৯(৬) অনুযায়ী প্রতি তিন বছর অন্তর নিম্নতম মজুরি পুনর্নির্ধারণের বিধান থাকায় এখনই মজুরি পুনর্বিবেচনার প্রক্রিয়া শুরু করা প্রয়োজন।
আবেদনে আরও বলা হয়, গত কয়েক বছরে খাদ্য, বাসাভাড়া, পানি-বিদ্যুৎ-গ্যাস, পরিবহন, চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কিন্তু শ্রমিকদের আয় সে অনুপাতে বাড়েনি। ফলে বর্তমান মজুরি দিয়ে শ্রমিকদের নিজেদের ও পরিবারের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে শ্রমিক পরিবারের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলেও দাবি করেছে সংগঠনটি। অপর্যাপ্ত আয়ের কারণে অনেক শ্রমিককে অতিরিক্ত সময় কাজ, ঋণ গ্রহণ অথবা পরিবারের খাদ্য, চিকিৎসা ও শিক্ষার মতো প্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে চলতে হচ্ছে।
সংগঠনটির ভাষ্য, ঢাকা, গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে অধিকাংশ শ্রমিক ভাড়াবাসায় বসবাস করেন। ক্রমবর্ধমান বাসাভাড়া ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে বর্তমান মজুরির সামঞ্জস্য নেই। ফলে অনেক শ্রমিককে ছোট ও অস্বাস্থ্যকর বাসস্থানে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বসবাস করতে হচ্ছে।
আবেদনে মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে শ্রমিক ও তার পরিবারের বাস্তব জীবনযাত্রার ব্যয়, খাদ্য ও পুষ্টি, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা, পরিবহন, শিশু পরিচর্যা, ইউটিলিটি ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, সামাজিক প্রয়োজন এবং শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা বিবেচনার দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি নারী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে শিশু পরিচর্যা, নিরাপদ যাতায়াত, মাতৃত্বকালীন সুবিধা, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তার বিষয়ও বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়।
গার্মেন্টস শ্রমিক পরিষদের আট দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—অবিলম্বে নিম্নতম মজুরি বোর্ড পুনর্গঠন ও কার্যক্রম শুরু, প্রকৃত ও প্রতিনিধিত্বশীল শ্রমিক প্রতিনিধি নিশ্চিত করা, শ্রমিক পরিবারের বাস্তব জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনা করে নতুন মজুরি নির্ধারণ, জীবনধারণ উপযোগী মজুরি বা ‘লিভিং ওয়েজ’-এর লক্ষ্য নির্ধারণ এবং মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভবিষ্যতে নিয়মিত মজুরি সমন্বয়ের ব্যবস্থা করা।
এ ছাড়া সাব-কন্ট্রাক্ট, ছোট ও অনিবন্ধিত কারখানাসহ তৈরি পোশাক শিল্পের সব শ্রমিককে নতুন মজুরি কাঠামোর আওতায় আনা, শ্রমিক-মালিক-সরকার ও বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণে স্বচ্ছ আলোচনা এবং শ্রমিক পরিবারের জীবনযাত্রার ব্যয় নির্ধারণে অংশগ্রহণমূলক জরিপ পরিচালনার দাবিও জানানো হয়েছে।
আবেদনে বলা হয়, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়; এটি শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার। শ্রমিকের জীবনমান উন্নত হলে কর্মদক্ষতা বাড়বে, শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক ইতিবাচক হবে এবং বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হবে।
এ অবস্থায় বর্তমান বাস্তবতা ও আইনগত বিধান বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত নিম্নতম মজুরি বোর্ড পুনর্গঠন, কার্যক্রম শুরু এবং তথ্যভিত্তিক ও জীবনধারণ উপযোগী নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে গার্মেন্টস শ্রমিক পরিষদ।