হারাধন সূত্রধর, পূর্বধলা (নেত্রকোণা) প্রতিনিধি:
নেত্রকোনার পাহাড়ের পাদদেশে সবুজের বিস্তার, পাশেই ভারতের সীমান্ত। নদী-ছড়া আর পাহাড়ের মিতালিতে নেত্রকোনার দুর্গাপুর ও কলমাকান্দার প্রকৃতি যেন ছবির মতো। এই সৌন্দর্যের টানে প্রতিবছর দেশ-বিদেশের পর্যটকেরা ছুটে আসেন এখানে। অথচ পাহাড়ঘেঁষা জনপদের বাসিন্দাদের কাছে পানিই হয়ে উঠেছে বছরের দুই মৌসুমের দুই রকম দুর্ভোগ। শুষ্ক মৌসুমে শুকিয়ে যায় পানির উৎস, আর বর্ষায় চারপাশ পানিতে ভরে গেলেও দেখা দেয় নিরাপদ পানির সংকট। এভাবেই বছরের পর বছর পানির কষ্টে দিন কাটছে সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকার মানুষের।
কলমাকান্দার লেংগুরা, খারনৈ ও রংছাতি ইউনিয়ন এবং দুর্গাপুরের কুল্লাগড়া ও সদর ইউনিয়নের পাহাড়ি এলাকাগুলোতে এ সংকট বেশি। এসব এলাকায় গারো, হাজংসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রায় ২১ হাজার ৬০৫ মানুষের বসবাস। দুর্গম এসব এলাকার অনেক পরিবার এখনো কূপ, পাহাড়ি ছড়া ও অল্পসংখ্যক নলকূপের ওপর নির্ভরশীল। পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে অনেক জায়গায় গভীর নলকূপ স্থাপন করাও কঠিন। ফলে কোনো কোনো এলাকায় পানির উৎস থাকলেও তা সারা বছর মানুষের চাহিদা পূরণ করতে পারে না।
শুষ্ক মৌসুমে শুকিয়ে যায় পানির উৎস
শুষ্ক মৌসুমে বৃষ্টি কমার সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ি ছড়াগুলো শুকিয়ে যায়। একই সঙ্গে কমতে থাকে কূপের পানিও। কোথাও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় অগভীর নলকূপেও পানি ওঠে না। তখন খাবার পানির জন্য দূরের উৎসের ওপর নির্ভর করতে হয়। নারী ও শিশুদের এক থেকে দেড় কিলোমিটার, কোথাও তারও বেশি পথ হেঁটে পানি সংগ্রহ করতে হয়।
কলমাকান্দার পাঁচগাঁও এলাকার বাসিন্দারা বলেন, ‘শুকনো মৌসুমে আমাদের সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয় পানির জন্য। বাড়ির আশপাশের কূপ ও ছড়ার পানি শুকিয়ে যায়, নলকূপেও ঠিকমতো পানি ওঠে না। তখন খাবার পানি আনতে অনেক দূরে যেতে হয়। একবারে যতটুকু পানি আনা যায়, তাতে সংসারের প্রয়োজন মেটে না। তাই দিনে কয়েকবার পানি আনতে যেতে হয়। আমাদের মতো পরিবারের নারীরাই মূলত এই কাজ করি। এতে ঘরের কাজেও সমস্যা হয়।’
কোথাও নলকূপে পানি মিললেও অতিরিক্ত আয়রনের কারণে তা ব্যবহারে ভোগান্তি রয়েছে। ফলে নিরাপদ পানি সংগ্রহ করাটাই অনেক পরিবারের প্রতিদিনের বড় কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বর্ষায় পানি বাড়ে, কমে নিরাপদ পানির উৎস
বর্ষা এলে দৃশ্যপট পাল্টে যায়। পাহাড়ি ছড়াগুলো পানিতে পূর্ণ হয়, চারপাশে বাড়ে পানির প্রবাহ। টানা বৃষ্টিতে বৃষ্টির পানিও সহজলভ্য হয়। অনেক পরিবার সেই পানি ধরে রেখে পান ও রান্নার কাজে ব্যবহার করে। কিন্তু অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল তখন তৈরি করে আরেক সংকট।
ঢলের পানিতে তলিয়ে যায় কূপসহ স্থানীয় পানির উৎস। সেই পানির সঙ্গে মিশে যায় ময়লা-আবর্জনা, কাদা ও পলি। কোথাও পানি ঘোলা হয়ে যায়, কোথাও কূপের তলায় জমে পলি। ফলে বর্ষায় পানির অভাব না থাকলেও নিরাপদ পানির উৎস কমে যায়। এমনকি ঢলের পানি নেমে যাওয়ার পরও অনেক সময় কয়েক দিন পর্যন্ত কূপের পানি ব্যবহারের উপযোগী থাকে না।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, ‘বর্ষায় আমাদের চারপাশে পানি থাকলেও সেই পানি পান করার উপায় থাকে না। একটু বেশি বৃষ্টি হলে কূপের পানি ঢলের পানিতে ডুবে যায়। ময়লা, কাদা ও পলি মিশে পানি ঘোলা হয়ে যায়। তখন বৃষ্টির পানি ধরে রাখার চেষ্টা করি। কিন্তু সব সময় পর্যাপ্ত পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হয় না। ঢল নেমে যাওয়ার পরও কয়েক দিন কূপের পানি ব্যবহার করা যায় না। তখন দূর থেকে নিরাপদ পানি সংগ্রহ করতে হয়।’
দূষিত পানিতে বাড়ে রোগের ঝুঁকি
পাহাড়ি ঢলের পর দূষিত বা অপরিষ্কার পানি ব্যবহারে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিও বাড়ে। বন্যা বা অন্য কোনো কারণে সুপেয় পানির সংকট দেখা দিলে পানি ফুটিয়ে অথবা পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ব্যবহার করে পান করা উচিত। বিশেষ করে পাহাড়ি ঢলের পর পানির উৎস দূষিত হলে এ বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি। দূষিত পানি ব্যবহারে ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েড, হেপাটাইটিস এ-সহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ে।
পাথরের স্তরে গভীর নলকূপ স্থাপনে জটিলতা
পাহাড়ি এলাকার ভূপ্রকৃতিও নিরাপদ পানি সরবরাহে বড় বাধা বলে মনে করছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এসব এলাকায় মাটির নিচে পাথরের স্তর থাকায় গভীর নলকূপ স্থাপন জটিল ও ব্যয়বহুল। এ কারণে প্রচলিত পানির উৎসের পাশাপাশি গভীর নলকূপ, রিংওয়েলসহ বিভিন্ন বিকল্প ব্যবস্থায় পানি সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
দুর্গাপুর ও কলমাকান্দার পাহাড়ি এলাকায় ৫২০ ফুট গভীর ৪০টি নলকূপ ইতিমধ্যে স্থাপন করেছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। প্রক্রিয়াধীন রয়েছে আরও কিছু নলকূপ। তবে বিস্তীর্ণ পাহাড়ি এলাকার তুলনায় এসব নলকূপ প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বলে দাবি স্থানীয়দের।
তাঁদের মতে, দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা ও একেকটি এলাকার মধ্যে দূরত্ব বেশি হওয়ায় একটি নলকূপ স্থাপন করলেই বড় এলাকার পানির সমস্যা মেটে না। বর্ষায় পানির উৎস দূষিত হওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় নিয়ে স্থায়ী সমাধানের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
প্রকল্পের আওতায় পানি সরবরাহের উদ্যোগ
নেত্রকোনার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নায়েব আলী খান জানান, সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় নিরাপদ পানি সরবরাহে প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্পের আওতায় গভীর নলকূপ স্থাপন করে বিভিন্ন এলাকায় পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা হবে।
তিনি বলেন, সমস্যা সমাধানে মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর এবং জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ও নেত্রকোণা-১ (কলমাকান্দা-দুর্গাপুর) আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার কায়সার কামাল কাজ করছেন। শিগগিরই এ সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
শুষ্ক মৌসুমে পানির উৎস শুকিয়ে যাওয়া এবং বর্ষায় নিরাপদ পানির সংকট—দুই মৌসুমের এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পেতে স্থায়ী ও টেকসই পানি সরবরাহব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দারা।