আয়াত উল্ল্যাহ,ঢাকা:
বর্তমান পরিবর্তনশীল ভূ-রাজনীতি, মুসলিম উম্মাহর অভ্যন্তরীণ সংকট এবং আগামী দিনে বিশ্ব রাজনীতিতে মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার রূপরেখা নিয়ে এবং দ্বীনি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রতি সোমবার বাদ এশা কসরে হাদী খানকা শরীফে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান আলোচক হিসেবে অত্যন্ত সময়োপযোগী ও দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব হযরত শাহ সুফি ইঞ্জিনিয়ার সৈয়দ আল হাদী।
তিনি তাঁর আলোচনায় বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে মুসলিম বিশ্বের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ও করণীয় সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তুলে ধরেন।
সাম্য ও ঐক্যের বিকল্প নেই
শাহ সুফি ইঞ্জিনিয়ার সৈয়দ আল হাদী বলেন, “বর্তমান বিশ্ব রাজনীতি এক জটিল ও ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। এই পরিস্থিতিতে মুসলিম উম্মাহ যদি তাদের অভ্যন্তরীণ বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হতে না পারে, তবে বিশ্ব দরবারে নিজেদের অধিকার ও অবস্থান ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে।” তিনি মুসলমানদের পারস্পরিক কাদা-ছোড়াছুড়ি বন্ধ করে ইসলামের মূল বাণী—সাম্য, ভ্রাতৃত্ব এবং কোরআন-সুন্নাহর আলোতে একতাবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।
প্রযুক্তি ও আধুনিক শিক্ষায় দীক্ষিত হওয়ার আহ্বান
ইসলাম ও বিজ্ঞানের মেলবন্ধনের ওপর জোর দিয়ে পেশায় প্রকৌশলী এই সুফি সাধক বলেন, “মুসলিম বিশ্বের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে হলে কেবল ঐতিহ্য আঁকড়ে থাকলেই চলবে না। আগামীর বিশ্বকে নেতৃত্ব দিতে হলে মুসলিম তরুণ প্রজন্মকে আধুনিক বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি এবং ভূ-রাজনীতি সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন করতে হবে।” তিনি উম্মাহর শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার তাগিদ দেন।
নেতৃত্ব সংকটের সমাধান ও নৈতিকতার উত্থান
মুসলিম বিশ্বের বর্তমান নেতৃত্ব সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সৈয়দ আল হাদী বলেন, “আজ মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে যোগ্য, দূরদর্শী এবং নিঃস্বার্থ নেতৃত্বের বড় অভাব। আগামীর নেতৃত্বকে হতে হবে আধ্যাত্মিক শক্তিতে বলীয়ান এবং আধুনিক জ্ঞানে সমৃদ্ধ। কেবল ক্ষমতার লোভ নয়, বরং মানবতার কল্যাণ ও ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠাই হতে হবে রাজনৈতিক দর্শনের মূল ভিত্তি।”
উগ্রবাদ বর্জন ও সুফিবাদের উদারতা
আলোচনায় তিনি চরমপন্থা ও উগ্রবাদের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, ইসলাম কখনোই সহিংসতা সমর্থন করে না। সুফিবাদের মূল বাণী হলো ভালোবাসা, পরমতসহিষ্ণুতা এবং আত্মশুদ্ধি। এই উদারনৈতিক সুফি দর্শনের মাধ্যমেই বিশ্বমঞ্চে ইসলামের প্রকৃত ও শান্তিপূর্ণ রূপ তুলে ধরা সম্ভব, যা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মুসলিমদের গ্রহণযোগ্যতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা
মুসলিম প্রধান দেশগুলোর বিপুল প্রাকৃতিক ও মানবসম্পদ থাকা সত্ত্বেও কেন তারা পিছিয়ে রয়েছে, সেই প্রশ্ন তুলে ধরে তিনি বলেন, “মুসলিম বিশ্বকে পরনির্ভরশীলতার শৃঙ্খল ভাঙতে হবে। নিজেদের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, বাণিজ্য জোরদার এবং একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ব্লক গড়ে তোলার মাধ্যমেই আগামী দিনে বিশ্ব রাজনীতিতে মুসলিম বিশ্ব অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারবে।”
পরিশেষে, শাহ সুফি ইঞ্জিনিয়ার সৈয়দ আল হাদী এক বুক আশা প্রকাশ করে বলেন, অন্ধকার যতই গভীর হোক না কেন, সঠিক জ্ঞান, নৈতিকতা এবং সুদৃঢ় নেতৃত্বের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহ আবারো বিশ্ব রাজনীতিতে অগ্রণী ও পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করবে।
উক্ত আলোচনা সভায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত বিশিষ্ট উলামায়ে কেরাম, বুদ্ধিজীবী, প্রকৌশলী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং সাংবাদিক সহ তরিকতপন্থী সাধারণ জনতা উপস্থিত থাকেন। বক্তার দূরদর্শী ও তাত্ত্বিক আলোচনা উপস্থিত শ্রোতাদের বিশেষভাবে আলোড়িত করে।