হারাধন সূত্রধর, পূর্বধলা (নেত্রকোণা) প্রতিনিধি:
পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শুভ জন্মাষ্টমী উপলক্ষে নেত্রকোণার পূর্বধলা উপজেলায় ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবমুখর পরিবেশে বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রা ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ, পূর্বধলা উপজেলা শাখার আয়োজনে শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) সকালে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানের শুরুতে পূর্বধলা উপজেলার সার্বজনীন কেন্দ্রীয় মন্দির প্রাঙ্গণ থেকে একটি বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করা হয়। শোভাযাত্রাটি উপজেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় মন্দির প্রাঙ্গণে গিয়ে শেষ হয়। এতে সনাতন ধর্মাবলম্বী হাজারো ভক্ত-অনুসারী ব্যানার ও ফেস্টুন নিয়ে অংশ নেন। শ্রীকৃষ্ণের নামসংকীর্তন, ধর্মীয় সংগীত ও ভক্তদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে পুরো এলাকা উৎসবমুখর হয়ে ওঠে।
মঙ্গল শোভাযাত্রার উদ্বোধন করেন পূর্বধলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শফিকুল ইসলাম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পূর্বধলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন। তাঁদের সার্বিক প্রশাসনিক ও আইনশৃঙ্খলা সহযোগিতায় অনুষ্ঠানটি শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হয়।
পরে বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ, পূর্বধলা উপজেলা শাখার সভাপতি বাবু তরুণ কুমার রায়-এর সভাপতিত্বে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। উপজেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের সম্মানিত সদস্য দীপক রঞ্জন সরকার-এর সঞ্চালনায় সভায় বক্তব্য দেন জীবন কৃষ্ণ দে, নিরঞ্জন কুমার ভাদুড়ী ও নিলয় চক্রবর্তী।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন উত্তর পূর্বধলা কালীমন্দিরের সভাপতি ডা. দ্বীজেশ রঞ্জন ভৌমিক (সুমন), চণ্ডীচরণ দাস, উৎপল সেন, উপজেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক লিটন সাহা, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রতন চন্দ্র দত্ত, দপ্তর সম্পাদক বিকাশ চন্দ্র ঘোষ, সাংগঠনিক সম্পাদক, মন্দির কমিটির চিত্রলেখা সিংহ, মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ।
এ ছাড়া পূর্বধলা উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে আগত বিভিন্ন পূজামন্দিরের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, বিভিন্ন পেশাজীবী, উপজেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক বিশ্বজিৎ রায় চৌধুরী, মন্দির কমিটির নেতৃবৃন্দ এবং সনাতন ধর্মাবলম্বী ভক্তবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব মানবসমাজে সত্য, ন্যায়, ধর্ম, মানবতা ও নৈতিকতার চেতনা জাগ্রত করার এক গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। শ্রীকৃষ্ণের জীবন ও দর্শনে অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে ন্যায় ও সত্যের প্রতিষ্ঠা, কর্তব্যনিষ্ঠা, মানবকল্যাণ এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্যের শিক্ষা রয়েছে। তাঁর আদর্শ অনুসরণ করে সমাজে শান্তি, সম্প্রীতি, সহনশীলতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
বক্তারা আরও বলেন, শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষা কেবল ধর্মীয় অনুশাসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তাঁর জীবনদর্শন মানুষের নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধকে সমৃদ্ধ করার পথ দেখায়। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার মাধ্যমে তিনি কর্ম, কর্তব্য, সত্য ও ন্যায়ের যে শিক্ষা দিয়েছেন, তা ব্যক্তি ও সমাজজীবনে আজও প্রাসঙ্গিক। ধর্মীয় উৎসবের মূল চেতনা হোক মানবিকতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতি—এ প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তাঁরা।
পূর্বধলা সার্বজনীন কেন্দ্রীয় মন্দিরের গোসাই নারায়ণ সাধু-এর উদ্যোগে দিনব্যাপী বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে পূজা-অর্চনা, নামসংকীর্তন ও ধর্মীয় নানা কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
জন্মাষ্টমী হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, দ্বাপর যুগে অধর্ম ও অত্যাচারের অবসান এবং ধর্ম ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব ঘটে। তাঁর জন্মতিথি উপলক্ষে ভক্তরা উপবাস, পূজা-অর্চনা, নামসংকীর্তন, ধর্মীয় আলোচনা ও বিভিন্ন মঙ্গল কর্মসূচির মাধ্যমে দিনটি পালন করেন।
অনুষ্ঠানে স্থানীয় প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মী ও সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন।
সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে জন্মাষ্টমীর এ আয়োজন পূর্বধলায় পরিণত হয় আনন্দঘন, ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ ও সম্প্রীতির এক মিলনমেলায়। উৎসবের মধ্য দিয়ে শান্তি, সৌহার্দ্য, মানবিকতা ও পারস্পরিক সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন আয়োজকরা।