মো: শাহরিয়ার
রাজিবপুর (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি:
কুড়িগ্রামের রাজিবপুর উপজেলার মোহনগঞ্জ ইউনিয়নের তিনথোপাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পথে প্রতিদিনই দেখা মেলে এক হৃদয়ছোঁয়া দৃশ্যের। কাঁধে বইভর্তি ব্যাগ, আর হাতে বন্ধুর ম্যানুয়াল হুইলচেয়ারের হাতল—এভাবেই বন্ধুকে ঠেলে স্কুলে নিয়ে যায় সাত বছরের মোহাম্মদ। তার বন্ধু সামিউলও সাত বছরের। জন্মগতভাবে একটি পা না থাকায় হুইলচেয়ারে চলাফেরা করতে হয় তাকে। তবে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাদের বন্ধুত্বে কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।
সামিউল ও মোহাম্মদের বাড়ি থেকে বিদ্যালয়ের দূরত্ব প্রায় আধা কিলোমিটার। প্রতিদিন সকালে নিজের বইভর্তি ব্যাগ কাঁধে নিয়ে মোহাম্মদ বন্ধুর হুইলচেয়ারের পেছনে দাঁড়ায়। এরপর প্রায় আধা কিলোমিটার পথ ঠেলে সামিউলকে নিয়ে পৌঁছে যায় স্কুলে। ক্লাস শেষে আবার বন্ধুকে সঙ্গে নিয়েই বাড়ির পথে ফেরে সে।
মোহাম্মদ বলে, “আমার বন্ধু আমার সব। প্রতিদিন তাকে স্কুলে নিয়ে যেতে পারলে আমার অনেক ভালো লাগে।” শিশুটির সরল এই কথায় ফুটে ওঠে বন্ধুত্বের গভীরতা।
সামিউলের বাবা বলেন, “প্রতিদিন মোহাম্মদ আমার ছেলেকে স্কুলে নিয়ে যায়। এতে আমি খুবই খুশি। ওরা দুজন একসঙ্গে পড়াশোনা করে, একসঙ্গে স্কুলে যায়—এটা একজন বাবা হিসেবে আমার জন্য অনেক আনন্দের।”
তিনথোপাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আমির হোসেন বলেন, “সামিউল পড়াশোনায় অনেক মেধাবী। তার শুধু একটি পা নেই। উন্নত চিকিৎসার মাধ্যমে কৃত্রিম পা সংযোজন করা গেলে সে সাধারণ মানুষের মতো হাঁটাচলা করতে পারবে বলে আমরা আশা করি।”
এলাকাবাসী জানান, সামিউল অত্যন্ত মেধাবী একজন শিক্ষার্থী। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। এক পায়ে ভর করে চলাফেরার পাশাপাশি পড়াশোনার সঙ্গে বিভিন্ন কাজও করে যাচ্ছে সে। তার মেধা ও আত্মবিশ্বাস দেখে অনেকেই মুগ্ধ।
বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি বলেন, “প্রতিবন্ধী শিশুরা দেশের বোঝা নয়। তাদের যথাযথ সুযোগ ও সহযোগিতা দেওয়া গেলে তারাই একদিন দেশের সম্পদ ও শক্তিতে পরিণত হতে পারে।” সামিউলের উন্নত চিকিৎসা ও ভবিষ্যতের জন্য সরকারের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ও হৃদয়বান মানুষদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
একদিকে শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে সামিউলের স্কুলে যাওয়ার অদম্য ইচ্ছা, অন্যদিকে বন্ধুর পাশে দাঁড়িয়ে মোহাম্মদের নিঃস্বার্থ সহযোগিতা—দুই শিশুর এই বন্ধুত্ব যেন মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। বয়স মাত্র সাত, কিন্তু তাদের বন্ধুত্বের শিক্ষা যেন অনেক বড়—বন্ধুত্ব মানে শুধু পাশাপাশি হাঁটা নয়, প্রয়োজনে বন্ধুর পথটুকুও নিজের কাঁধে তুলে নেওয়া।