খুলনা ব্যুরোঃ
সারাদেশের ন্যায় খুলনা নগরীতেও প্রতিনিয়ত ডেঙ্গুর প্রকোপ ও সংক্রমণের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। মশার বংশবিস্তার রোধ ও ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর জোরদার নজরদারির দাবি যখন জোরালো হয়ে উঠছে, ঠিক তখনই নগরীর কেন্দ্রস্থলেই দেখা গেছে চরম অবহেলার চিত্র। খুলনা নগরীর ঐতিহ্যবাহী মহসিন রোডের টুটপাড়া খবরের মোড়ের অদূরে একটি নির্মাণাধীন ভবনের বেজমেন্টে মাসের পর মাস পানি জমে থাকার গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। দীর্ঘদিনের এই জমে থাকা পানি এখন রূপ নিয়েছে এডিস মশার নিরাপদ প্রজননক্ষেত্রে, যা আশপাশের পুরো এলাকাবাসীর জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি ও চরম আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঘটনাস্থল পরিদর্শনে দেখা যায় এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, উক্ত ভবনটির নির্মাণকাজ দীর্ঘদিন ধরে চলাকালে কিংবা থমকে থাকার কারণে এর বিশাল বেজমেন্টে বৃষ্টির পানি ও পয়োনিষ্কাশনের পানি জমে একাকার হয়ে আছে। কোনো প্রকার নিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকায় এই আবদ্ধ পানি পচে দূষিত হচ্ছে এবং মশার লার্ভা জন্মানোর শতভাগ উপযোগী পরিবেশে পরিণত হয়েছে। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু ভাইরাসের বাহক এডিস মশা সাধারণত যেকোনো পাত্র, ড্রাম কিংবা ভবনের বেজমেন্টে জমে থাকা পরিষ্কার ও আংশিক পরিষ্কার পানিতে দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে। টুটপাড়া এলাকার এই ভবনের জমে থাকা পানি যেন মশার জন্য এক আদর্শ অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। ফলে সন্ধ্যা নামলেই নয়, দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টাই ওই এলাকার বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মশার উৎপাতে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন সর্বস্তরের মানুষ।
এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা চরম ক্ষোভ ও উৎকণ্ঠা প্রকাশ করে জানান, নগরীতে ইতিমধ্যে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এই অবস্থায় ঘরের পাশেই যদি দিনের পর দিন এমন কৃত্রিম জলাশয় ও মশার প্রজননকেন্দ্র তৈরি হয়ে থাকে, তবে পরিবারের ছোট শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে নিরাপদে বসবাস করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। তারা বলেন, “আমরা নিজেদের বাড়িঘর ও আঙ্গিনা পরিষ্কার রাখলেও লাভ হচ্ছে না, কারণ পাশের এই বিশাল নির্মাণাধীন ভবনের বেজমেন্ট থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ মশা জন্ম নিচ্ছে। নির্মাণাধীন ভবনের মালিকপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের চরম দায়িত্বহীনতা ও উদাসীনতার কারণেই আজ এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।”
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, কেবল ভবন মালিকদের সচেতনতার ওপর ছেড়ে দিলে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) এবং নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নিয়মিত মাঠপর্যায়ের পরিদর্শন, কঠোর প্রশাসনিক নজরদারি এবং জরিমানামূলক জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি ছিল। পরিদর্শনের অভাব ও তদারকি না থাকায় ভবন মালিকরা দীর্ঘদিন ধরে এভাবে নিয়মকানুন তোয়াক্কা না করে বেজমেন্টে পানি জমিয়ে রাখার সুযোগ পাচ্ছেন।
এ অবস্থায় ডেঙ্গু মহামারি আকার ধারণ করার আগেই অতি দ্রুত উক্ত ভবনের বেজমেন্ট থেকে সেচ পাম্পের মাধ্যমে জমে থাকা পানি অপসারণ, মশক নিধন ওষুধ স্প্রে করা এবং স্থায়ী নিষ্কাশন ব্যবস্থা গ্রহণের জোরালো দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। একই সাথে যেসব ভবনে নিয়মিত পানি জমে থাকে, সেসব ভবন মালিকদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বানও জানান তারা।
নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু প্রতিরোধে কেবল সিটি করপোরেশনের মশক নিধন অভিযানের ওপর নির্ভর করে বসে থাকলে চলব না। এডিস মশার প্রজনন ধ্বংস করতে নির্মাণাধীন ভবনের ডেভেলপার ও মালিক, বাড়ির ছাদ, বেজমেন্ট এবং আশেপাশের ড্রেন পরিষ্কার রাখার ক্ষেত্রে ব্যক্তিপর্বেও চরম সচেতনতা অবলম্বন করতে হবে। অন্যথায় মশার প্রজননস্থল দিন দিন বৃদ্ধি পেয়ে খুলনা নগরীতে ডেঙ্গুসহ অন্যান্য মশাবাহিত রোগ ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।