ব্যুরো প্রধান, খুলনা:
খুলনার সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অভূতপূর্ব উন্নয়ন এবং অপরাধের শেকড় উৎপাটনে জেলার চারটি উপজেলায় কঠোর ও বিশেষ যৌথ অভিযান শুরু হয়েছে। এলিট ফোর্স এসআরবি, খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি) এবং জেলা পুলিশের সমন্বয়ে গঠিত যৌথবাহিনী গত মঙ্গলবার থেকে রূপসা, দিঘলিয়া, তেরখাদা ও বটিয়াঘাটা উপজেলায় এ সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করছে।
গত বুধবার বিকেল সাড়ে তিনটায় জেলা পুলিশ সুপারের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ প্রেস ব্রিফিংয়ে এই বিশেষ অভিযানের বিস্তারিত তুলে ধরেন খুলনা জেলার সুযোগ্য পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক।
অভিযানের মূল লক্ষ্য: মাদক নির্মূল ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার
প্রেস ব্রিফিংয়ে পুলিশ সুপার দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন যে, চলমান এই বিশেষ অভিযানের মূল অভীষ্ট লক্ষ্য হলো মাদকদ্রব্যের ভয়াল থাবা থেকে সমাজকে রক্ষা করা এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে উল্লেখ করেন, খুলনায় সংঘটিত অধিকাংশ টার্গেট কিলিংয়ের পেছনে মাদকের কালো ছায়া রয়েছে। মাদকের বিস্তার রোধ ও অপরাধীদের কঠোরহাতে দমনে এই অভিযান অত্যন্ত ফলপ্রসূ হবে।
চলতি বছরে খুলনার অপরাধ চিত্র তুলে ধরে এসপি জানান, এ পর্যন্ত জেলায় মোট ৩৫টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে পুলিশি বিচক্ষণতা ও তৎপরতায় ২৫টি ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করা হয়েছে এবং বাকি ১০টির তদন্ত অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে চলমান রয়েছে।
হত্যাকাণ্ডগুলোর কারণ বিশ্লেষণ করে পুলিশ সুপার জানান:
গুলিসংক্রান্ত ঘটনা: ৯টি
মাদকসংক্রান্ত বিরোধ: ৩টি
পারিবারিক বিরোধ: ৪টি
সামাজিক ও অন্যান্য কারণ: ১৩টি
রাজনৈতিক কারণ: ২টি
অজ্ঞাত কারণ: ২টি
নবজাতক হত্যা (শ্বাসরোধ): ২টি
ভৌগোলিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কঠোর কৌশল
খুলনার ভৌগোলিক অবস্থান অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে কিছুটা চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে উল্লেখ করে পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক বলেন, রূপসা নদী ও ভৈরব নদের কারণে নগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অপরাধীরা প্রায়ই এক এলাকায় অপরাধ ঘটিয়ে খুব দ্রুত অন্য এলাকায় পালিয়ে যায়। বিশেষ করে রূপসা উপজেলা ঘনবসতিপূর্ণ হওয়ায় সেখানে অপরাধীরা সহজেই আত্মগোপনের চেষ্টা করে।
এই ভৌগোলিক প্রতিকূলতা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সম্পূর্ণ প্রস্তুত বলে জানান তিনি। এসপি ঘোষণা করেন, আগামী এক সপ্তাহকে সর্বোচ্চ চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেওয়া হয়েছে এবং এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে একটি দৃশ্যমান ও ইতিবাচক পরিবর্তন সাধিত হবে।
লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ জোর
প্রেস ব্রিফিংয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এ-সার্কেল) সাইফুল ইসলাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য প্রকাশ করে বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় লুট হওয়া কিছু অস্ত্র এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এই অস্ত্রের একটি বড় অংশ বর্তমানে দুষ্কৃতকারী ও সন্ত্রাসীদের হাতে রয়েছে, যা জননিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। এসব অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে যৌথবাহিনী সর্বশক্তি দিয়ে মাঠে নেমেছে এবং খুব দ্রুতই অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হবে।
মাদক ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসী ও অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের এই আপসহীন ও কঠোর অবস্থান খুলনাবাসীর মনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে শুরু করেছে। সাধারণ মানুষ আশা করছেন, এই যৌথ অভিযানের মাধ্যমে খুলনা একটি নিরাপদ, শান্তিময় ও মাদকমুক্ত জনপদে রূপ নেবে।